ওজন নিয়ন্ত্রণে সঠিক পথ্য: কোমরের মেদ ও অতিরিক্ত ঘাম মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২২ রাত
  • ২৬৯৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
২০ বছর বয়সী এক তরুণীর উচ্চতা ৫৭ ইঞ্চি, ওজন ৬২ কেজি এবং কোমরের মাপ ৩৯ ইঞ্চি। এই উচ্চতা ও ওজন অনুযায়ী BMI প্রায় ২৯.৫, যা স্বাস্থ্যকর ওজনের তুলনায় বেশি। তবে শুধু BMI দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। কোমরের পরিধি, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুম এবং সামগ্রিক জীবনযাপনও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বুকের মাপ ওজন নির্ধারণের প্রধান সূচক নয়। এ অবস্থায় লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুত ওজন কমানো নয়; বরং ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা। সুষম পথ্য, পরিমিত খাবার, নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম ও প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান—এই অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদে ওজন ও কোমরের পরিধি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
সুস্থ ওজন নিয়ন্ত্রণের মূলনীতি
ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য না খেয়ে থাকা, খাবার বাদ দেওয়া কিংবা কঠোর ডায়েট অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। খাবারের পরিমাণ ও গুণগত মানের পাশাপাশি দৈনন্দিন শারীরিক কার্যক্রম বাড়ানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, মাছ, ডিম, ডাল, মুরগি, ফল এবং পরিমিত ভাত বা রুটি রাখা যেতে পারে। ভাত সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সহজ।
সকালের নিয়মিত পথ্য
ঘুম থেকে উঠে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করা যেতে পারে। এরপর পুষ্টিকর নাশতা গ্রহণ করা ভালো।
নাশতার উদাহরণ:
* ১টি ডিম * ১–২টি আটার রুটি* রান্না করা সবজি * অথবা অল্প পরিমাণ ওটস* প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ * চিনি ছাড়া বা অল্প চিনি দিয়ে চা পরোটা, পুরি, কেক, পেস্ট্রি, মিষ্টি বিস্কুট ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার নিয়মিত নাশতা হিসেবে না রাখাই ভালো। নাশতা ধীরে ধীরে খেতে হবে এবং খাবারের পর কিছুক্ষণ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা যেতে পারে।
দুপুরের নিয়মিত পথ্য
দুপুরের খাবার হবে পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে শাকসবজি ও প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।
দুপুরের খাবারের উদাহরণ:
* পরিমিত ভাত* ১ পিস মাছ অথবা পরিমাণমতো মুরগিডাল* পর্যাপ্ত শাকসবজি* শসা, টমেটো বা অন্যান্য সালাদ* প্রয়োজন অনুযায়ী পানিশুধু আলু, ভর্তা বা ভাজা খাবারের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের সবজি খাদ্যতালিকায় রাখা ভালো। খাবার ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাওয়া এবং অতিরিক্ত পেট ভরে যাওয়ার আগেই খাওয়া শেষ করার অভ্যাস করা উচিত।
বিকেলের পথ্য
বিকেলে ক্ষুধা লাগলে ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত মিষ্টির পরিবর্তে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
উদাহরণ:* ১টি মৌসুমি ফল * পেয়ারা, আপেল, কমলা বা পেঁপে * অল্প পরিমাণ ছোলা * পরিমাণমতো বাদাম * শসা বা টমেটো * চিনি ছাড়া চাফলের জুসের পরিবর্তে পুরো ফল খাওয়াই ভালো। সিঙ্গারা, সমুচা, চিপস, চানাচুর, মিষ্টি ও কেককে নিয়মিত বিকেলের নাশতা বানানো উচিত নয়।
রাতের নিয়মিত পথ্য
রাতের খাবার দিনের অন্যান্য প্রধান খাবারের তুলনায় হালকা ও পরিমিত রাখা যেতে পারে।উদাহরণ:* ১–২টি আটার রুটি অথবা পরিমিত ভাত* মাছ, ডিম বা ডাল * পর্যাপ্ত সবজিসালাদ * প্রয়োজন অনুযায়ী পানি।রাতে অতিরিক্ত ভাত, বিরিয়ানি, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া এবং অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার সীমিত করা উচিত। রাতের খাবারের পর চিপস, বিস্কুট, মিষ্টি বা অপ্রয়োজনীয় নাশতা এড়িয়ে চলুন।
খাবারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
১. প্রতিদিন প্রোটিন রাখুনমাছ, ডিম, ডাল, মুরগি ও ছোলা নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখুন।
২. সবজি বাড়ানবিভিন্ন ধরনের শাকসবজি প্রতিদিনের খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করুন।
৩. ফল পরিমাণমতো খানফল স্বাস্থ্যকর হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
৪. চিনি কমানমিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি, চকলেট, মিষ্টি বিস্কুট এবং চিনিযুক্ত চা-কফি সীমিত করুন।
৫. কোমল পানীয় এড়িয়ে চলুনচিনিযুক্ত কোমল পানীয় ও প্যাকেটজাত মিষ্টি পানীয়ের পরিবর্তে পানি বেছে নিন।
৬. ভাজাপোড়া সীমিত করুনসিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, পরোটা ও অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার নিয়মিত খাবেন না।
৭. অতিরিক্ত লবণ কমানখাবারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ এবং অতিরিক্ত লবণযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার কমিয়ে দিন।
প্রতিদিনের হাঁটা ও ব্যায়াম
ওজন ও কোমরের পরিধি নিয়ন্ত্রণে খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা যেতে পারে। শরীর অভ্যস্ত হলে ধীরে ধীরে সময় ও কার্যক্রম বাড়িয়ে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য রাখা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি সপ্তাহে কয়েক দিন হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করে থাকলে প্রথম দিন থেকেই কঠিন ব্যায়াম না করে ধীরে শুরু করাই নিরাপদ।
সারাদিন সক্রিয় থাকুন
শুধু নির্দিষ্ট সময় ব্যায়াম করলেই হবে না; দিনের অন্যান্য সময়ও যতটা সম্ভব সক্রিয় থাকা প্রয়োজন।* দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকবেন না।* মোবাইল ব্যবহারের মাঝে উঠে কিছুক্ষণ হাঁটুন।* অল্প দূরত্বে সম্ভব হলে হেঁটে যান।* ঘরের স্বাভাবিক কাজে সক্রিয় থাকুন।* পড়াশোনা বা কম্পিউটারের কাজের মাঝে নিয়মিত বিরতি নিন।
ঘুমের নিয়ম ঠিক করুন
স্বাস্থ্যকর ওজন নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস তৈরি করুন।
রাত জাগা এবং ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস কমানো ভালো। ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার বা অতিরিক্ত নাশতা না খাওয়াই ভালো।
অতিরিক্ত ঘামের ক্ষেত্রে করণীয়
গরম আবহাওয়া বা ব্যায়ামের সময় ঘাম হওয়া স্বাভাবিক। অতিরিক্ত ঘাম হলে শরীর থেকে পানি ও কিছু ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি হতে পারে। তাই তৃষ্ণা, আবহাওয়া ও শারীরিক কার্যক্রম অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।তবে বেশি পানি পান করলেই ওজন কমে না।
পানি শরীরের প্রয়োজন মেটানোর জন্য; ওজন কমানোর বিশেষ কৌশল হিসেবে অতিরিক্ত পানি পান করার প্রয়োজন নেই।
বিশ্রামের সময়ও অস্বাভাবিক ঘাম হলে, বিশেষ করে রাতে প্রচুর ঘাম, বুক ধড়ফড়, হাত কাঁপা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, মাসিকের অনিয়ম বা হঠাৎ ওজন পরিবর্তনের মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যে অভ্যাসগুলো বাদ দিতে হবে
ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিতভাবে—* না খেয়ে থাকা * খাবার বাদ দেওয়া* অত্যন্ত কম খাবার খাওয়া* তথাকথিত ‘slimming tea’-এর ওপর নির্ভর করা * detox drink’-কে ওজন কমানোর সমাধান মনে করা* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা* অতিরিক্ত ব্যায়াম করা* সম্পূর্ণভাবে ভাত বা সব ধরনের কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়া—এসব পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত নয়। নিয়মিত মেনে চলার সহজ দৈনিক রুটিন
সকাল:পানি → পুষ্টিকর নাশতা → ১০–১৫ মিনিট স্বাভাবিক হাঁটা
দুপুর: পরিমিত ভাত → মাছ/মুরগি/ডাল → পর্যাপ্ত সবজি → সালাদ
বিকেল: মৌসুমি ফল → অল্প ছোলা/বাদাম → প্রয়োজন হলে চিনি ছাড়া চা
সন্ধ্যা: প্রায় ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা অথবা সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম
রাত: হালকা ও পরিমিত খাবার → অতিরিক্ত নাশতা নয় → স্বাভাবিক হাঁটাচলা
ঘুম: প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা
সারাদিন: তৃষ্ণা, আবহাওয়া ও শারীরিক কার্যক্রম অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি
ওজন ও কোমরের মাপ পর্যবেক্ষণবর্তমানে ওজন ৬২ কেজি এবং কোমরের মাপ ৩৯ ইঞ্চি। প্রতিদিন ওজন মাপার প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে একদিন একই সময়ে, একই ধরনের পোশাকে ওজন মাপা যেতে পারে। কোমরের পরিধিও নির্দিষ্ট বিরতিতে একই পদ্ধতিতে মাপা ভালো।উচ্চতা ৫৭ ইঞ্চি হওয়ায় BMI প্রায় ২৯.৫। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং কোমরের অতিরিক্ত মেদ কমানোর চেষ্টা করা। একসঙ্গে অনেক কেজি কমানোর পরিবর্তে ছোট ছোট পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখাই বেশি কার্যকর।
শেষ কথাস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন কোনো কয়েক দিনের ডায়েট নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস। প্রতিদিনের খাবারে পরিমিতি, পর্যাপ্ত শাকসবজি ও প্রোটিন, নিয়মিত হাঁটা, প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান, ভালো ঘুম এবং অপ্রয়োজনীয় মিষ্টি ও ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।লক্ষ্য হবে দ্রুত ওজন কমানো নয়, বরং নিয়মিতভাবে সুস্থ থাকা।কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ নয়—সুষম পথ্য।অতিরিক্ত ব্যায়াম নয়—নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম।সাময়িক পরিবর্তন নয়—দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।এই তিন নীতিই হতে পারে সুস্থ ওজন নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো ভিত্তি।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি



কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad