মূলধনী যন্ত্র আমদানি কমেছে ৩৩ শতাংশ, বিনিয়োগে ধীরগতি

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৯ দুপুর
  • ২২৯৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
দেশে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে ধীরগতির প্রভাব পড়েছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ। উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি, ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে ৩০ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ।

নতুন বিনিয়োগে অনীহা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় নতুন বিনিয়োগের গতি কমেছে। উচ্চ সুদহার ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকায় উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে ঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যয়ও বাড়িয়েছে। বড় সরকারি প্রকল্প কমে যাওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতির চাহিদাও কমেছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা সম্প্রসারণের বদলে ব্যবসায়ীরা বিদ্যমান কার্যক্রম সচল রাখার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির মাধ্যমে সাধারণত নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ করা হয়। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়। ফলে এ ধরনের যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়া বিনিয়োগ স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল ইসলাম বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা সমাধান না হলে নতুন শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা কম। ইউটিলিটি সুবিধা ছাড়া কোনো শিল্পকারখানা পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সরকার থেকে দুই বছরেও গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না—এমন বাস্তবতা জানিয়ে দেওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন করে মেশিনারি এনে ঝুঁকিতে পড়তে চাইছেন না।

মাসাদুল ইসলাম আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের সমস্যাও এখনো কাটেনি। উচ্চ সুদহার, ঋণপ্রাপ্তির সমস্যা ও ব্যাংকিং খাতের নানা সংকট বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে ঘুষ-দুর্নীতিও আগের তুলনায় বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে ঝুঁকি এড়িয়ে চলছেন।

সরকারি প্রকল্প কমায় যন্ত্রপাতির চাহিদাও কমেছে

মাসাদুল ইসলাম বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কমে যাওয়ারও বড় প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যয়ের বড় একটি অংশ উন্নয়ন প্রকল্পনির্ভর ছিল। গত কয়েক বছরে আগের অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু নতুন প্রকল্পের কাজও তেমন শুরু হয়নি। এতে সরকারি ব্যয় কমার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পে মূলধনী যন্ত্রপাতির চাহিদাও কমেছে।

অন্যান্য মূলধনী পণ্য আমদানিও কমেছে

জুলাইয়ে অন্যান্য মূলধনী পণ্য আমদানি কমেছে ২৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে মাসটিতে মূলধনী পণ্য আমদানি কমেছে ২৭ দশমিক ২০ শতাংশ।

তবে এ সময়ে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। এর মধ্যে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তবে পরিমাণের দিক থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়েনি।

অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। অন্যান্য মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ২০ শতাংশ।

খাদ্যশস্য ও ভোগ্যপণ্যে আমদানি বেড়েছে

গত জুলাইয়ে চাল আমদানি ব্যাপক কমলেও গমের আমদানি বেড়েছে। সব মিলিয়ে খাদ্যশস্যের আমদানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সময়ে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে ২৪ শতাংশ।

ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন গতি

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। গত জুন শেষে এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন। টানা কয়েক মাস ধরেই ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে রয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে নতুন ঋণের চাহিদা কমে যায়। নতুন শিল্প স্থাপন বা বড় ধরনের সম্প্রসারণ না হলে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও স্বাভাবিকভাবেই সীমিত থাকে।

বন্ধ কারখানা সচল করা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা দিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন করবে। উভয় ক্ষেত্রেই সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি

রপ্তানি আয় কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৫০ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা ১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়া, ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি এবং বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই দেশের বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে চাপের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad