ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিক্সের (আইএফআর) তথ্য অনুযায়ী, শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী রোবট তৈরিতে ২০২৩ সালে জার্মানিকে পেছনে ফেলে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে চীন। চার বছরের মধ্যে দেশটি এ খাতে নিজেদের সক্ষমতা দ্বিগুণ করেছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় প্রতিবছর নতুন রোবট সংযোজনের দিক থেকেও চীন বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে।
‘মেড ইন চায়না’ উদ্যোগ ও বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় সরকারি তহবিল এবং বিশেষায়িত মেগা-ফান্ডের মাধ্যমে রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে বেইজিং। বৈশ্বিক হিউম্যানয়েড রোবট স্টার্টআপগুলোর মোট বিনিয়োগের অর্ধেকের বেশি চীনে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোবোটিক্সে যুক্তরাষ্ট্রও অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, প্রতিরক্ষা খাত এবং টেসলা ও বোস্টন ডায়নামিক্সের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের মাধ্যমে এআই ও সফটওয়্যারনির্ভর উন্নত রোবট তৈরিতে এগিয়ে রয়েছে দেশটি। ঐতিহ্যবাহী শিল্প রোবট উৎপাদন ও গবেষণায় জাপান এবং কারখানায় কর্মীর তুলনায় রোবটের ঘনত্বের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়াও বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
কৃষি ও চিকিৎসায় বাড়ছে রোবটের ব্যবহারচীনের কৃষি খাতে কর্মরত মানুষের বড় একটি অংশের বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তরুণ প্রজন্মের কায়িক শ্রমে আগ্রহ কমে যাওয়ায় আগামী দুই দশকে সম্ভাব্য শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় কৃষিতে রোবট ব্যবহারের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো। এনভিডিয়া চিপনির্ভর বিশেষায়িত কৃষি রোবট তৈরিতেও বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
শিল্প ও লজিস্টিকসের পাশাপাশি চিকিৎসা খাতেও চীনা রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। চিকিৎসকদের সহায়তায় তৈরি এসব রোবট সূক্ষ্ম কাজ সম্পাদনে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এর মধ্যে একটি রোবট কোয়েলের কাঁচা ডিমের খোসা সূক্ষ্মভাবে ছাড়িয়ে সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। প্রস্তুতকারকদের দাবি, পশ্চিমা যন্ত্রপাতির তুলনায় প্রায় অর্ধেক খরচে এসব মেডিকেল রোবট পাওয়া যাচ্ছে। ক্যানসার অপসারণ ও জটিল অস্ত্রোপচারে এগুলো ব্যবহারের ফলে রক্তপাত ও ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
চীনা রোবটে আগ্রহ সৌদি আরবেরতেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রোবোটিক্স খাতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে রিয়াদ। নির্মাণ, লজিস্টিকস ও পৌরসেবার পাশাপাশি তেল-গ্যাস ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে রোবট উৎপাদনের অবকাঠামো গড়ে তুলতেও চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করছে দেশটি।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান ‘মিকবট’ সৌদি আরামকোর স্থাপনাগুলোতে ব্যবহারের উপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চার পা বিশিষ্ট রোবট তৈরি করছে। তেলক্ষেত্র, পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা ও খনির মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে এসব রোবট কাজ করতে পারবে। ফলে শ্রমিকদের সরাসরি ঝুঁকিতে না ফেলে বিপজ্জনক এলাকা পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া সফটব্যাংক গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে ১৫ কোটি ডলার ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় শিল্প রোবটের কারখানা নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছে সৌদি প্রশাসন।
আমদানির পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তরের পরিকল্পনাসৌদি ও চীনা নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও চুক্তিগুলো থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, রিয়াদ শুধু রোবট আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। নিজস্ব মূলধন ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে চীনা কোম্পানির সহযোগিতায় সৌদি আরবেই উন্নত রোবট উৎপাদন, গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়।
এর মাধ্যমে দেশটির তরুণদের জন্য উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। রোবোটিক্সে চীনের দ্রুত অগ্রগতির পাশাপাশি সৌদি আরবের এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের নতুন দিক উন্মোচন করছে।
তথ্যসূত্র: ডয়েচে ভেলে, ডেইলি এশিয়ান নিউজ, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিক্স (IFR) এবং চায়না রোবট ইন্ডাস্ট্রি অ্যালায়েন্স।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক