টেক জায়ান্টের বিনিয়োগে বড় বাধা সাবমেরিন ক্যাবল সংকট

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২১ দুপুর
  • ৫৯৯৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বাংলাদেশে গুগল, মেটা, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও সাবমেরিন ক্যাবলের স্বল্পতা, ল্যান্ডিং স্টেশনের সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমতি পেতেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছ থেকে অনুমোদন নিতে গিয়ে সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত সময় লাগছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাওয়া ক্লাবে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট: টেক জায়ান্টদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে বাধা ও সমাধান কোথায়?’ শীর্ষক কর্মশালা ও আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিন। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাবেক সভাপতি সমীর কুমার দে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রকল্পপ্রধান মাহমুদ শাহেদ ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) কোষাধ্যক্ষ মঈন উদ্দিন আহমেদ।

অনুষ্ঠানে আইএসপিএবি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম, সিডিনেট কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মশিউর রহমান এবং বাংলাদেশ এনজিওএস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ব ইন্টারনেটের ৯০-৯৫ শতাংশ সাবমেরিন ক্যাবলনির্ভর

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র দুটি সাবমেরিন ক্যাবল ও দুটি ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে এবং এ খাতে কোম্পানি রয়েছে একটি।

আইটিসি ও টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল থাকলেও এগুলো মূলত ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য ও বিকল্প সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ বাড়ানো জরুরি বলে মত দেন বক্তারা।

ব্যান্ডউইথের বড় অংশ ব্যবহার করছে টেক জায়ান্টরা

মূল প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ১৩ দশমিক ৫ টেরাবাইট ব্যান্ডউইথ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে গুগল ব্যবহার করছে ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ, মেটা ২৬ থেকে ২৭ শতাংশ, আকামাই ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ এবং ক্লাউডফ্লেয়ার ও অ্যামাজন ৬ থেকে ৭ শতাংশ।

বক্তাদের মতে, এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপন করলে দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।

বিনিয়োগের আগে ১০০ পয়েন্টের মূল্যায়ন

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে রাজনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ১০০ পয়েন্টের একটি ‘স্কোর কার্ড’ বা চেকলিস্ট বিবেচনা করে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্রিড ব্যবস্থার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ খাতে প্রায় ২২ শতাংশ ওয়েটেজ রয়েছে।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নির্ভরযোগ্য গ্রিড ব্যবস্থা বড় বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যান্ডউইথের চাহিদা এবং নতুন বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলের ৩৩ থেকে ৩৫ মিলিসেকেন্ড লেটেন্সিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অনুমোদনে সাত-আট মাস

বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে অনুমোদনের জন্য প্রায় ১০টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এতে সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায় বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

বক্তারা বলেন, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা চালু করা হলে সময় ও জটিলতা কমবে। একই সঙ্গে নীতিমালার ধারাবাহিকতা ও আইনি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সম্ভাব্য বিনিয়োগ ৩৫ বিলিয়ন ডলার

আলোচনায় বলা হয়, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দেশে এলে তাদের বিনিয়োগ সাধারণত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে শুরু হতে পারে। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা ৩৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

বক্তাদের মতে, প্রতিটি টেক জায়ান্টের সাইটে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে।

প্রতিযোগিতা বাড়লে কমতে পারে ইন্টারনেটের দাম

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে ইন্টারনেট খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা বাড়লে ইন্টারনেটের দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে এবং ডিজিটাল যোগাযোগ অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।

বক্তারা বলেন, টেক জায়ান্ট বাংলাদেশে আসুক বা না আসুক, দেশে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির বিনিয়োগ ও আয়

মূল প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি এখন পর্যন্ত ৮১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে ব্যয় করা হয়েছে ৭৫ কোটি টাকা।

আইএসপিএবির প্রস্তাব

সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে আইএসপি খাতের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল বিনিয়োগ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা;

একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ও ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন;

আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথে ক্যারিয়ার-নিউট্রাল ও অ্যাক্টিভ শেয়ারিং চালু;

সরকারি ফাইবার অবকাঠামোকে ‘ফাইবার ব্যাংক’ হিসেবে আইএসপিদের ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া;

স্থানীয় পিয়ারিং ও আইএসপির সংখ্যা বাড়ানো;

বিভাগ ও শহর পর্যায়ে ডেটা সেন্টার, ক্লাউড ও সিডিএন অবকাঠামো গড়ে তোলা;

গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণে সরকারি প্রণোদনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।

আইএসপি খাতের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে ইন্টারনেটের খরচ কমানোর পাশাপাশি মানসম্মত ও অর্থবহ ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশে আরও অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ২৪, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad