ইউনিফিল প্রত্যাহার ঘিরে দক্ষিণ লেবাননে নিরাপত্তা শঙ্কা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৫ রাত
  • ২৬২৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ইউনিফিলের (UNIFIL) ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। লেবানন ইউনিফিলের ম্যান্ডেট বাড়ানো অথবা তাদের পরিবর্তে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানালেও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের এই মিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার ঘটনা ঘটছে। কোথাও হামলার পর আগুন লাগলেও ইসরায়েলি বাহিনীর আগাম অনুমতি ছাড়া সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা ঘটনাস্থলে যেতে পারছেন না।

দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির অন্যতম দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে কাজ করছে ইউনিফিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বাহিনীটি অনেকটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘চোখ’ হিসেবে বিবেচিত। ফলে ইউনিফিল প্রত্যাহার হলে নজরদারি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বৈরুত।

প্রায় ৩ লাখ মানুষ এখনো ঘরে ফেরেনি

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের বহু শহর ও গ্রাম এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংঘাত কমে আসার পর কয়েক লাখ মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরলেও প্রায় ৩ লাখ মানুষ এখনো বাড়িতে ফিরতে পারেননি।

এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র রয়েছে। বহু বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং অনেক ভবন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পুনর্গঠন কার্যক্রমও এখনো বড় পরিসরে শুরু হয়নি।

ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে। তবে ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযানকে নিরাপত্তা এবং হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত করে থাকে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান ও বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

২০২৬ সালের শেষে শেষ হচ্ছে ইউনিফিলের ম্যান্ডেট

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০২৫ সালে সিদ্ধান্ত নেয়, ইউনিফিলের ম্যান্ডেট ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত শেষবারের মতো বাড়ানো হবে। এরপর বাহিনীটির পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার শুরু হবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে প্রত্যাহার সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।

১৯৭৮ সালে দক্ষিণ লেবাননে ইউনিফিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের পর এর দায়িত্ব আরও বাড়ানো হয়। যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে সহায়তা এবং দক্ষিণ লেবাননে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে।

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিফিল প্রত্যাহারের পর দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তার দায়িত্ব ধীরে ধীরে লেবাননের সরকারের হাতে যাওয়ার কথা।

বিকল্প আন্তর্জাতিক উপস্থিতি চায় বৈরুত

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বিভিন্ন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠকে ইউনিফিলের পরও দক্ষিণ লেবাননে আন্তর্জাতিক উপস্থিতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গেও বৈঠকে তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন।

সালামের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ইউনিফিলের ম্যান্ডেট বাড়ানো অথবা এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে বাহিনীটি চলে যাওয়ার পরও দক্ষিণ লেবাননে নজরদারি, তথ্য প্রতিবেদন ও যোগাযোগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায়।

তিনি ইসরায়েলকে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার এবং হামলা বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি লেবাননের সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের পুরো ভূখণ্ডে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও সতর্ক করেছেন, ইউনিফিলের ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার পর বিকল্প কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনী না থাকলে দক্ষিণাঞ্চলে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে।

ইউনিফিল নিয়ে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়। তাদের যুক্তি, কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ সেখানে সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

ইসরায়েলের দাবি, জাতিসংঘের মিশন হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইউনিফিলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিশন শেষ হওয়ার পর লেবাননের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে লেবানিজ আর্মির হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।

তবে জাতিসংঘের বক্তব্য, ইউনিফিলের দায়িত্ব শুধু হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা করা নয়। যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, মানবিক সহায়তার পথ সুগম করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং উত্তেজনা কমাতেও বাহিনীটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনা

ইউনিফিল-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বৈরুত ও জাতিসংঘের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা চলছে। ফ্রান্সের উদ্যোগে প্যারিসে ইউরোপীয় ও আরব দেশগুলোর সামরিক কর্মকর্তারা দক্ষিণ লেবাননের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বৈঠক করেছেন। সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনীর সক্ষমতা এবং ইউনিফিল প্রত্যাহারের পর সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।

ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যাতে ইউনিফিল চলে যাওয়ার পর আকস্মিক নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি না হয় এবং ধীরে ধীরে নিরাপত্তার দায়িত্ব লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা যায়।

তবে দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান ও চলমান অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে ইউনিফিল প্রত্যাহারের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সামনে আসছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা চলে গেলে দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?

এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। তবে ইউনিফিলের ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার আগে লেবানন, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে একটি কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা ও রয়টার্স




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad