তথ্যসূত্র: আলজাজিরা; ভাষান্তর: তহমিনা মিলি
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা ও বড় শক্তিধর দেশগুলোর ভেটো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা যোগ দেওয়ার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনসহ বিভিন্ন সংকটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতা এ বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় প্রভাব ফেলে। কোনো বিষয়ে স্থায়ী সদস্যের ভেটো থাকলে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আটকে যেতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
১৯৩ দেশের সমান ভোটএর বিপরীতে সাধারণ পরিষদে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রত্যেকের ভোটের অধিকার সমান। ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সমর্থন আদায়, সমঝোতা ও কূটনৈতিক দরকষাকষির বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই মঞ্চ।
সাধারণ পরিষদে বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব থাকায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থানও এখানে প্রতিফলিত হয়। যদিও সাধারণ পরিষদের অধিকাংশ প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের মতো বাধ্যতামূলক নয়, তবু এসব ভোট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৬০ সাল থেকে সাধারণ পরিষদে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। আফ্রো-এশীয় জোট এবং পরবর্তী সময়ে ৭৭টি দেশের জোট বা ‘জি-৭৭’-এর মাধ্যমে এসব দেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজেদের সম্মিলিত প্রভাব বাড়িয়েছে। এই জোটে জামাইকার মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্রাজিল ও ভারতের মতো বড় দেশও রয়েছে।
মানবাধিকার ও উপনিবেশবিরোধী উদ্যোগউন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি ও মানবাধিকারের বিভিন্ন ইস্যুতে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সম্মিলিত ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের পদ সৃষ্টির উদ্যোগও এর একটি উদাহরণ।
১৯৬৫ সালে কোস্টারিকা সাধারণ পরিষদে এ পদ সৃষ্টির প্রস্তাবের নেতৃত্ব দেয়। পরে ১৯৯৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের পদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে মানবাধিকার জাতিসংঘের আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।
সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় উপনিবেশবাদের অবসান, জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং বৈষম্য মোকাবিলার মতো বিষয়ও আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় গুরুত্ব পেয়েছে।
গাজা ও ইউক্রেন ইস্যুতে ভূমিকাগাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও ত্রাণ সরবরাহে বাধা দেওয়ার ঘটনায় সাধারণ পরিষদে একাধিক প্রস্তাব পাস হয়েছে। এসব প্রস্তাবে বিপুলসংখ্যক দেশের সমর্থন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের অবস্থানকে তুলে ধরেছে।
ইউক্রেন সংকটেও নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থার বাইরে সাধারণ পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর ‘শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ’ বা ‘ইউনাইটিং ফর পিস’ প্রক্রিয়ার অধীনে সাধারণ পরিষদে আলোচনা হয়।
জাতিসংঘের ৩৭৭ নম্বর প্রস্তাবের আওতায় এই ব্যবস্থা ১৯৫০ সালের নভেম্বরে চালু করা হয়েছিল। নিরাপত্তা পরিষদ কোনো বিষয়ে অচলাবস্থায় পড়লে সাধারণ পরিষদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করার সুযোগ এ ব্যবস্থায় রয়েছে। এর আওতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং শান্তি ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে শক্তি ব্যবহারের সুপারিশও করা যেতে পারে।
২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ‘ইউনাইটিং ফর পিস’ প্রক্রিয়া তিনবার কার্যকর করা হয়। এ সময় নিরাপত্তা পরিষদের পরিবর্তে সাধারণ পরিষদে ইউক্রেন সংকট নিয়ে পৃথক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এসব প্রস্তাবে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানানো এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের জন্য রাশিয়ার সমালোচনা করা হয়।
ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর প্রভাবনিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান অচলাবস্থা দ্রুত দূর হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত হওয়ায় বড় শক্তিধর দেশগুলোর কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি এবং ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর ভূমিকা বাড়াতে সাধারণ পরিষদের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে মানবিক বিপর্যয়, বড় ধরনের সংঘাত বা নৃশংসতার মতো পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহত্তর মতামত তুলে ধরার একটি বিকল্প মঞ্চ হিসেবে কাজ করতে পারে।
গত আট দশকে সাধারণ পরিষদ বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সম্মিলিত কূটনৈতিক শক্তি ব্যবহারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন, মানবাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও বৈষম্যবিরোধী বিভিন্ন উদ্যোগে এ মঞ্চের ভূমিকা রয়েছে।
ফলে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো-নির্ভর অচলাবস্থার পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতিতে সাধারণ পরিষদের প্রভাবও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ন্যায়সংগত বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যৎ বিতর্কে সাধারণ পরিষদ আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
লেখক: আলান্না ও’ম্যালি, অধ্যাপক ও গ্লোবাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ওয়েলথ বিভাগের চেয়ার, ইরাসমাস ইউনিভার্সিটি রটারড্যাম, নেদারল্যান্ডস।
মূল নিবন্ধ: আলজাজিরা
বাংলা ভাষান্তর: তহমিনা মিলি

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক