রেমিট্যান্স-রিজার্ভের শক্তিতে টাকার প্রত্যাবর্তন

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৬ দুপুর
  • ২৬২৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
আমাদের অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে এক কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করেছে। বিশ্ব অর্থনীতির নানা টানাপোড়েন, বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হওয়া ডলার-সংকটের প্রভাবে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়—সবাইকে এক ধরনের অস্বস্তির মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দ্রুত অবমূল্যায়ন কেবল আমদানি খাতকেই সংকটে ফেলেনি, বরং নিত্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছিল। টানা সাড়ে পাঁচ বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে যে মন্দা ও অস্থিরতার মেঘ জমেছিল, তা যেন কাটছিলই না। তবে অর্থনীতির অমোঘ নিয়মে অন্ধকার সময় পার করে আবার স্বস্তির আলো ফিরে আসে। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় মুদ্রা ‘টাকা’ আবার তার পুরোনো শক্তি ও মর্যাদা নিয়ে সগৌরবে ফিরে আসতে শুরু করেছে। টাকার সাড়ে পাঁচ বছরের পতনমুখী ধারার পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকা এখন সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। টাকার এই গতিপথ বদল এবং অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্সের জোয়ার, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী নীতিগত নজরদারির এক যৌথ ফসল। মুদ্রার বিনিময় হারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২১ সালে যেখানে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা, সেখানে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও দেশের অভ্যন্তরে ডলারের চরম ঘাটতির কারণে ধীরে ধীরে তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় গিয়ে ঠেকেছিল। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছরের এই ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের ধারায় প্রথম বড় ধরনের ইতিবাচক মোড় দেখা যায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ০.০৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আপাতদৃষ্টিতে এই বৃদ্ধির হার ছোট মনে হলেও, দীর্ঘদিনের লাগাতার দরপতনের বৃত্ত ভেঙে যে টাকার মান বাড়তে শুরু করেছে, এটি ছিল তারই সুস্পষ্ট সংকেত। পরবর্তী সময়ে এই ইতিবাচক ধারা আরও বেগবান হয়। চলতি বছরের ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর—মাত্র আড়াই সপ্তাহের ব্যবধানে টাকার মান আরও ০.৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এতে করে বাজারে ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে কমে সমতলে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। এই মূল্যহ্রাস কেবল গাণিতিক সংখ্যার খেলা নয়; এটি দেশের বহিঃখাত ও আর্থিক কাঠামোর ভিত্তিমূল শক্তিশালী হওয়ার এক বাস্তব প্রমাণ। টাকার এই প্রত্যাবর্তনের মূল কারিগর ও প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি। বৈশ্বিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা আনুষ্ঠানিক বা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে যে গভীর আস্থা দেখিয়েছেন, তা জাতীয় অর্থনীতিকে নতুন শক্তিতে বলীয়ান করেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মাত্র আড়াই মাসে, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৭.৭০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩.৮ শতাংশ বেশি। ব্যাংকিং খাতে হুন্ডিভিত্তিক অবৈধ লেনদেনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর সুবিধার কারণে প্রবাসী আয়ের এই ঢল সামষ্টিক অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করেছে। রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবাহের প্রত্যক্ষ ও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভে। মাত্র দুই বছর আগেও যেখানে রিজার্ভের আশঙ্কাজনক পতন সামাল দেওয়াই নীতিপ্রণেতাদের প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ ছিল, আজ সেখানে এক শক্ত সুরক্ষার দেয়াল গড়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ২৪.৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এসে ৩৬.৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এ সময়ে রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় ৪৬.৬ শতাংশ। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী হিসাব করা রিজার্ভও ৫৮.৮ শতাংশ বেড়ে ৩১.৫৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাজারে যখন বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বাড়ছিল, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলো থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কিনে নিয়ে দেশের রিজার্ভকে আবার পুনর্গঠন করার নীতি গ্রহণ করে, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত শুভ ফল বয়ে এনেছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট আর্থিক খাতের বিশ্লেষক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, রেমিট্যান্সের এই উল্লম্ফন এবং রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান দেশের বৈদেশিক খাতে এক ধরনের টেকসই স্থিতিশীলতা তৈরি করছে। প্রথাগত ব্যাংকিং মাধ্যমে ডলারের পর্যাপ্ত সরবরাহ বাড়ায় একদিকে যেমন ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটছে, অন্যদিকে আমদানির দায় মেটাতে দেশের সক্ষমতা ও মর্যাদা আগের চেয়ে অনেক বাড়ছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সহযোগী ও আমদানিকারকদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি ও ভাবমর্যাদার বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে। আলী হোসেন প্রধানিয়া আরও উল্লেখ করেন, টাকা শক্তিশালী হওয়ার সবচেয়ে বড় সুফল পাওয়া যাবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বাজারে। জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য, শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে এখন স্থানীয় মুদ্রায় বা টাকায় তুলনামূলক কম ব্যয় হবে। ফলে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে, যা স্বাভাবিকভাবেই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যমূল্যের চাপ কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামে সাময়িক উত্থান-পতন থাকলেও ডলারের বিপরীতে টাকার মান শক্তিশালী থাকায় আমদানিকৃত পণ্যের মাধ্যমে যে মূল্যস্ফীতি ঘটেছিল, তা কাটিয়ে ওঠা অনেক সহজ হবে। পূর্বে ডলার-সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণপত্র বা এলসি খুলতে যেভাবে দ্বিধাবোধ করত, সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতি সহজ ও স্বাভাবিক হচ্ছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট কৌশলগত তদারকির কথা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। তাঁর মতে, বাজারে পর্যাপ্ত রেমিট্যান্স আসার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিটি বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অর্থপাচার, বাণিজ্যভিত্তিক আর্থিক অনিয়ম এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কৃত্রিম সংকট বা অপব্যবহার রোধে ব্যাংক ও অনুমোদিত ডিলার শাখাগুলোতে ধারাবাহিক তদারকি বজায় রাখা হয়েছে। এর ফলেই বাড়তি ডলারের প্রবাহ সঠিকভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে যুক্ত হয়ে রিজার্ভ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখছে এবং প্রকৃত আমদানিকারকদের প্রয়োজনীয় ডলারের চাহিদা মেটাতে সমর্থ হচ্ছে। টাকা শক্তিশালী হওয়ার এই যাত্রা শুধু নীতিনির্ধারক বা অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও মানুষের সাধারণ জীবনে বহুমাত্রিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কম খরচে জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানি সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমবে এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকার ও বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধেও আগের চেয়ে কম টাকা খরচ হবে, যা রাজস্ব বাজেটের ওপর থেকে বাড়তি চাপ অনেকটাই হালকা করবে। তবে এই অর্জনকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের এই অর্জিত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় আরও বাড়ানোর কার্যকর কৌশল নিতে হবে, হুন্ডি ও অবৈধ লেনদেনের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে এবং সতর্কতার সঙ্গে আমদানি ব্যবস্থাপনা বজায় রাখতে হবে। সব মিলিয়ে, টানা সাড়ে পাঁচ বছরের সংকট কাটিয়ে ডলারের বিপরীতে টাকার এই আত্মবিশ্বাসী প্রত্যাবর্তন কেবল একটি মুদ্রার দরবৃদ্ধির খবর নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক বলিষ্ঠ দলিল। রেমিট্যান্সের জোয়ার ও রিজার্ভের শক্তিমত্তা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দেশীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে—এমনটিই প্রত্যাশা। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।



কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad