বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৭ দুপুর
  • ১৯৩৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
আজ ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে রোগীর অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির ঝুঁকি কমানো, নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং রোগী নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) উদ্যোগে ২০১৯ সাল থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

২০২৬ সালের বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসের প্রতিপাদ্য—‘Safe care for noncommunicable diseases’ বা ‘অসংক্রামক রোগে নিরাপদ চিকিৎসাসেবা’। এবারের স্লোগান ‘Safe care for life!’। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত ও দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিতে হয়। ফলে রোগ নির্ণয়, ওষুধ গ্রহণ, চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রোগী নিরাপত্তা বলতে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সময় অপ্রয়োজনীয় বা প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে বোঝায়। হাসপাতাল, ক্লিনিক, চিকিৎসকের চেম্বার কিংবা অন্য যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগী যেন সঠিক রোগ নির্ণয়, যথাযথ ওষুধ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং নিরাপদ পরিচর্যা পান—এটাই রোগী নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে স্বাস্থ্যসেবার মান অনেক উন্নত হয়েছে। তবে চিকিৎসাব্যবস্থায় ভুল, ওষুধের ভুল নাম বা মাত্রা, রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব, স্বাস্থ্যসেবাজনিত সংক্রমণ, তথ্যের ঘাটতি, যোগাযোগের দুর্বলতা কিংবা চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবে রোগী অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির শিকার হতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী প্রতি ১০ জনে প্রায় একজন কোনো না কোনোভাবে ক্ষতির শিকার হন এবং এর প্রায় অর্ধেকই প্রতিরোধযোগ্য।

বিশেষ করে অসংক্রামক রোগ—যেমন হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ—ব্যবস্থাপনায় রোগীকে দীর্ঘ সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। এ কারণে চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। WHO বলছে, অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে বারবার যোগাযোগের কারণে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের কাছে যান সুস্থ হওয়ার আশায়। তাই চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন তিনি নতুন কোনো প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। চিকিৎসাজনিত সব ধরনের জটিলতা বা ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও যথাযথ সতর্কতা, নিরাপত্তা-প্রটোকল, কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। চিকিৎসার আগে রোগীর পরিচয় সঠিকভাবে নিশ্চিত করা, রোগের ইতিহাস ও অ্যালার্জির তথ্য যাচাই করা, চলমান ওষুধের তালিকা জানা, ওষুধের নাম ও মাত্রা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

একইভাবে রোগী ও স্বজনদেরও চিকিৎসককে আগের রোগ, অ্যালার্জি, চলমান ওষুধ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যতথ্য জানাতে হবে। চিকিৎসা বা ওষুধ সম্পর্কে কোনো বিষয় অস্পষ্ট থাকলে প্রশ্ন করা উচিত। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, হাত পরিষ্কার রাখা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে চলা এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যের সঠিক আদান-প্রদান রোগী নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ এবং চিকিৎসাজনিত ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে। WHO-ও নিরাপদ রোগ নির্ণয়, ওষুধের নিরাপত্তা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং রোগীদের চিকিৎসা-প্রক্রিয়ায় অংশীদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

রোগী নিরাপত্তা কেবল হাসপাতাল বা চিকিৎসকের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিষয়। রোগীর সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর্মীর দায়িত্বশীলতা, প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কার্যকর উদ্যোগ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে রোগীদের নিজেদের চিকিৎসার অংশীদার হিসেবে সম্পৃক্ত করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত ও শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় রোগীর নিরাপত্তাঝুঁকি কমাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের বিষয় নয়; এটি নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবাকে দৈনন্দিন চিকিৎসাচর্চার অংশ করে তোলার আহ্বান। সঠিক রোগ নির্ণয়, নিরাপদ ওষুধ প্রয়োগ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, সচেতন রোগী এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পান।

ডা. কাকলী হালদার
সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), World Patient Safety Day 2026; WHO South-East Asia; WHO Patient Safety Fact Sheet।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad