আলোকিত জাতি গঠনে শিক্ষা :ড. মাহরুফ চৌধুরী

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৯ দুপুর
  • ৬৫৫৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg আলোকিত জাতি গঠনে শিক্ষা ড. মাহরুফ চৌধুরী

আলোকিত জাতি গঠনে শিক্ষা

ড. মাহরুফ চৌধুরী

নৈতিক রাষ্ট্র নির্মাণের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। একটি রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো যতই উন্নত ও সুসংগঠিত হোক, যদি তার নাগরিকদের নৈতিক বোধ, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়-অন্যায়ের বিচারক্ষমতা দুর্বল থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও কার্যকর রাখা কঠিন। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রটি শেষ পর্যন্ত পরিচালিত হয় মানুষ দিয়ে, আর সেই মানুষের মূল্যবোধ, বিবেক ও আচরণ গড়ে ওঠে শিক্ষার নানামুখি দীর্ঘ পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আইন মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে, কিন্তু নৈতিক শিক্ষা মানুষকে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে উপলব্ধি ও বিশ্বাস করতে শেখায়। প্রশাসনিক ব্যবস্থা কর্তব্য পালনে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু নাগরিক দায়িত্ববোধ মানুষকে দায়িত্বকে নিজের নৈতিক দায় হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়। এই অর্থে সামগ্রিক শিক্ষা প্রক্রিয়া তথা অনানুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষার মাধ্যমেই নাগরিকের মধ্যে দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচারের চেতনা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবিকতার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের দায়িত্ব শুধু নিজের অধিকার দাবি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, ভিন্নমত সহ্য করা, শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং বৃহত্তর জনকল্যাণের কথা বিবেচনা করাও তার দায়িত্ব। এই মূল্যবোধগুলো কেবল আইন বা পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা মুখস্থ করিয়ে অর্জন করানো যায় না। এগুলো গড়ে ওঠে এমন শিক্ষার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের নৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে ভাবতে শেখে, অন্যের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে এবং নিজের সিদ্ধান্তের সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হয়। ফলে নৈতিক শিক্ষা কোনো আলাদা বিষয় বা পরীক্ষার অংশমাত্র নয়; এটি জীবনব্যাপী শিক্ষার সমগ্র প্রক্রিয়ায় এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত থাকা প্রয়োজন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা উন্নয়নকে প্রায়ই ভৌত অবকাঠামো তথা ভবন, সড়ক, সেতু, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করি। এসব অবশ্যই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক; কিন্তু এগুলো উন্নয়নের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। একটি দেশের ভবন যত উঁচু কিংবা দৃষ্টিনন্দনই হোক না কেন, যদি তার নাগরিকেরা অসহিষ্ণু হন; প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, যদি মানুষ মিথ্যা ও অপতথ্যের কাছে সহজেই আত্মসমর্পণ করে; অর্থনীতি যত বড়ই হোক, যদি সমাজে ন্যায়বোধ ও মানবিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে সেই উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ মানবিক উন্নয়ন বলা যায় না। উন্নয়নের বস্তুগত সূচকের পাশাপাশি তাই একটি জাতির বৌদ্ধিক, নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সক্ষমতাকেও উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়নের গভীরতর চিত্র পাওয়া যায় তার পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশে। সেখানে পারিবারিক পরিমন্ডলে সম্পর্ক কত মানবিক, সুনিবিড় ও সুদৃঢ়,এবং নবীন, প্রবীণ ও দুর্বলের মর্যাদা কতটুকু সুসংহত; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে, শিক্ষক কতটা নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন, গবেষক কতটা স্বাধীনভাবে প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করতে পারেন এবং একটি প্রতিষ্ঠান কতটা সত্যের অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করে; সামাজিক পরিবেশে পরমতসহিষ্ণুতা, সহানুভূতি-সহমর্মিতা এবং সামাজিক ন্যায্যতা; রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে আইনের শাসন, জান-মাল-সম্মানের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার এসবই একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির দৃশ্যমান পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যে দেশে প্রশ্ন করা অপরাধ, ভিন্নমত প্রকাশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্ষমতাসীন মতের সমালোচনা অনাকাঙ্ক্ষিত, সেখানে বাহ্যিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটলেও প্রকৃত অর্থে মানবিক, নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে না।

বিশেষ করে সত্য অনুসন্ধানের স্বাধীনতা একটি সুস্থ সামাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণশক্তি। সত্য কখনো কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক নিয়মই হলো প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা, প্রমাণ পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন হলে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত সংশোধন করা। তাই যে রাষ্ট্র তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই অনুসন্ধানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, সে কেবল ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করে না; সে এমন নাগরিক তৈরি করে যারা গুজবের পরিবর্তে প্রমাণ, আবেগের পরিবর্তে যুক্তি এবং অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে বিবেকের ওপর নির্ভর করতে শেখে। আর এই নাগরিকরাই শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক, দায়িত্বশীল ও টেকসই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার উন্নয়নে আমাদের করণীয় কী? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু অবকাঠামোগতভাবে সম্প্রসারণ করলেই হবে না; এর দর্শন, পরিচালন কাঠামো, নেতৃত্ব, শিক্ষকতা, গবেষণা-সংস্কৃতি এবং শিক্ষার্থী-অভিজ্ঞতার মৌলিক ভিত্তিকেও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের আলোকে রাষ্ট্র শিক্ষার স্তরভিত্তিক যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, শিক্ষাপরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নকে প্রতিটি স্তরে সেই লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এবং পরিববর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সাথে মিল রেখে জনশক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা কোনো সরকারের সাময়িক রাজনৈতিক কর্মসূচি বা ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হতে পারে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, নৈতিক ও আইনী সুরক্ষার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তার অগ্রগতি নিশ্চিত করার কৌশলগত ভিত্তি।

রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপে অপরিহার্য অংশ হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থার এই পুনর্গঠনের প্রথম শর্তই হলো শিক্ষাঙ্গনের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষককে যেন কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা গোষ্ঠীগত চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিজের জ্ঞান, যুক্তি ও গবেষণার ভিত্তিতে মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। কারণ যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা নেই, সেখানে সৃজনশীলতার সুযোগ থাকে না; আর সৃজনশীলতা ছাড়া জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি কিংবা স্বনির্ভর জাতি গঠন সম্ভব নয়। এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্নটি। শিক্ষার মনোন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগ, তাঁদের পদোন্নতি ও একাডেমিক নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত সম্পর্কের পরিবর্তে মেধা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও কর্ম-অভিজ্ঞতা, গবেষণা, শিক্ষাদানের দক্ষতা, পেশাগত সততা ও নিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের দক্ষতা ও সক্ষমতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমাদেরকে একজন শিক্ষক, শিক্ষাবিশেজ্ঞ কিংবা শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষানুরাগীর পরিচয়গত পার্থক্য; তাঁদের পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতার যে পার্থক্য সেগুলো সুচারুভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। কেবল ক্ষমতাসীন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতের সমর্থক হিসেবে নয়, বরং শিক্ষাক্ষেত্রে সঠিক নেতৃত্বের জন্য কাউকে নিয়োগ প্রদানের পূর্বে জ্ঞানসৃষ্টিকারী ও জ্ঞানবিনিময়কারী পেশাজীবী হিসেবে তার যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতে দিতে হবে, যারা একাডেমিক উৎকর্ষে অগ্রগণ্য, ন্যায়সংগত প্রশাসন পরিচালনার সক্ষমতার রেখেছেন, এবং কাজকর্মে স্বচ্ছতা প্রদর্শন ও মতের বৈচিত্র্যকে সম্মান করেন। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো শিক্ষানীতি বা সংস্কারই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে না।

রাষ্ট্রকে সামাজিক চুক্তির শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে একই সঙ্গে আগামী প্রজন্ম তথা শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, তবে কোনোভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার সংঘাতের ক্ষেত্র হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিমন্ডলে দলীয় রাজনীতি নয়; তাদের অধিকার, শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনীতিতে অংশ নেবে। শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র, সংবিধান, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনীতি, পরিবেশ, জননীতি ও সমসাময়িক জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়ে জানবে, বিতর্ক করবে এবং নিজস্ব মত গড়ে তুলবে এটাই কেবল কাম্যই নয়, অপরিহার্য। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যেন দলীয় রাজনীতির লেজুড়ভিত্তিতে কিংবা একাডেমিক মূল্যায়ন, সুযোগ, নেতৃত্ব বা সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ডে পরিণত না হয়। শিক্ষার্থীদের রাজনীতি যদি নাগরিক সচেতনতা, নেতৃত্বের বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অনুশীলন হয়, তবে তা হবে ইতিবাচক এবং জাতীয় অগ্রগতির সহায়ক; কিন্তু তা যদি দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, ভয়ভীতি, দলীয় নির্দেশ পালন কিংবা ক্ষমতার আনুগত্যের প্রশিক্ষণে পরিণত হয়, তাহলে তা হবে শিক্ষার উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং জাতির জন্য আত্মঘাতী।

ছাত্ররাজনীতিকে দলীয় রাজনীতির নাগপাশ থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি গবেষণা, বিতর্ক ও মুক্তচিন্তার পরিবেশকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত করতে হবে। বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, প্রমাণ খুঁজতে, তথ্য যাচাই করতে এবং ভিন্ন ব্যাখ্যার তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে শেখানো প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় যৌক্তিক চিন্তার এই সংস্কৃতিকে আরও গবেষণাভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নৈতিক ও একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তঃবিষয়ক (ইন্টারডিসিপ্লিনারি) সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানসম্প্রদায় (ইন্টালেক্চুয়াল কমিউনিটি) ও পেশাগত সম্প্রদায়ের (কমিউনিটি অব প্রেক্টিস) সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কোন একটি বিষয়ে বিতর্ককে বিরোধিতা হিসেবে নয়, নিজেকে সমৃদ্ধ করার এবং জ্ঞান সৃষ্টির একটি স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের শিক্ষকের বক্তব্যকে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন করতে পারে, কিংবা একজন গবেষক যদি প্রচলিত কোনো তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নির্ভয়ে আলোচনা করতে পারেন, তখনই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সহিংসতা, ভয়ভীতি এবং গোষ্ঠীগত আধিপত্যের সংস্কৃতিও সম্পূর্ণভাবে দূর করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, ধর্ম, সামাজিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত মতের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে; কোনো শিক্ষক যেন প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কায় নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত না হন। শিক্ষাঙ্গনে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ হবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির মাধ্যমে; ভয় প্রদর্শন, দখল কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে নয়। এ ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, স্বচ্ছ শৃঙ্খলাবিধি এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন ছাড়া একদিকে যেমন মুক্তচিন্তা কিংবা সৃজনশীলতা কোনোটিই বিকশিত হতে পারে না; অপরদিকে ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির পথ সংকোচিত হয়ে পড়ে।

মানবিকতা, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে শিক্ষার প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে না রেখে এর কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু কীভাবে ভালো চাকরি পেতে হয় তা শেখালে চলবে না; তাকে শেখাতে হবে কেন একজন ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের সক্রিয় অংশীদার হতে হবে এবং কীভাবে হতে হয়। সততা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব, দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান এমূল্যবোধগুলো শিক্ষার প্রতিটি স্তরে চর্চার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে। কারণ মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা কোনো আলাদা পরীক্ষার বিষয় নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সংস্কৃতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের মধ্য দিয়ে শেখানো হয়। এই সবকিছুর সমন্বিত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা একই সঙ্গে জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিক, মানবিক ও মুক্তচিন্তার ব্যক্তি-মানুষ তৈরির পাশাপাশি দেশের জন্য সুনাগরিক তৈরি করবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থার সমন্বয়ে একটি ধারাবাহিক শিক্ষাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে নিশ্চিত করতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক দর্শন ও প্রতিষ্ঠানগত অগ্রাধিকার যেন বারবার পরিবর্তিত না হয়, সে দিকে আমাদের বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। তাতে একদিকে যেমন জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ হবে, অপরদিকে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাবে। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাপরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায় করা। শিক্ষা কোনো দলের সম্পত্তি কিংবা নিয়ন্ত্রণ ও মতাদর্শ প্রচারের কৌশল নয়; এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আমরা হয়তো শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে পারব, কিন্তু নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম ও আলোকিত জাতি গড়ে তুলতে পারব না।

আমাদের শিক্ষাঙ্গন হোক সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে আলোর প্রতিষ্ঠান যেখানে জ্ঞান হবে মুক্ত, চিন্তা হবে স্বাধীন, মতের বৈচিত্র্য হবে স্বীকৃত ও সমৃদ্ধির উপায় এবং মানুষের মর্যাদাকে দেওয়া হবে সর্বোচ্চ মূল্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার অনুগত প্রতিষ্ঠান না হয়ে সত্যের অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। যে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সাহস নেই, সেখানে জ্ঞানের বিকাশ থেমে যায়; যে শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি মেধার বিকল্প হয়ে ওঠে, সেখানে সৃজনশীলতা ও নৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার না বানিয়ে জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, মানবিক উৎকর্ষ এবং নাগরিক কল্যাণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংসদ ভবনে যতটা না নির্ধারিত হবে, তার চেয়েও বেশি নির্ধারিত হবে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, পাঠাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত চিন্তার পরিসরে এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে গণসচেতনা বৃ্দ্ধিতে সামাজিক পরিমন্ডলে। সংসদ রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করতে পারে, সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, প্রশাসন তা বাস্তবায়ন করতে পারে; কিন্তু সেই রাষ্ট্র ও সমাজকে কেমন মানুষ পরিচালনা করবে, তারা কতটা ন্যায়নিষ্ঠ, যুক্তিবাদী, মানবিক ও দায়িত্বশীল হবে তার ভিত্তি নির্মিত হয় শিক্ষার মধ্য দিয়েই। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে তার ভবিষ্যৎ।

একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হয়তো খুব বেশি সময় লাগে না; ভয়, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতপ্রকাশের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আনুগত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তা দ্রুত করা সম্ভব। কিন্তু একটি মুক্ত, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি, নৈতিক নাগরিকত্ব এবং সুপরিকল্পিত জনকল্যাণমুখী নীতিমালার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। আমাদের বুঝতে হবে যে, সেই কাজের কেন্দ্রবিন্দুটিই হলো শিক্ষা। কারণ মুক্ত সমাজ কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না; তাকে ধারণ করার মতো মুক্তমনা মানুষও তৈরি করতে হয়। গণতন্ত্র কেবল একটি সংবিধানিক ব্যবস্থা নয়; এটি পারস্পারিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার একটি বাস্তবমুখী জীবনচর্চা, আর সেই জীবনচর্চার ভিত্তি নির্মাণ করে শিক্ষাই। এই কারণে রাজনীতির শিক্ষা আমাদের শিক্ষার একটা অনুষঙ্গ হলেও রাজনীতিকীকরণ থেকে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত রাখা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার রাজনীতি মানে শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার রাজনীতিকীকরণ নয়। অপরদিকে শিক্ষার বিরাজনীতিকীকরণ রাজনীতিকে অস্বীকার করাও নয়; বরং শিক্ষাকে তার প্রকৃত জাতীয় দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে তোলা। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে কিন্তু দলীয় আনুগত্য থাকবে না; মতাদর্শ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকবে কিন্তু যৌক্তিক চিন্তার বিকাশ, গবেষণা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না; নেতৃত্ব থাকবে কিন্তু তা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে; সমালোচনা থাকবে কিন্তু তা হবে যুক্তি ও প্রমাণনির্ভর; এবং সবচেয়ে বড় কথা, যেখানে কোনো ক্ষমতার চেয়ে সত্যের মূল্য বেশি হবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে শিক্ষার রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে এমন শিক্ষাপরিকল্পনাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে, যা ক্ষমতাসীন সরকার বা দলের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করবে।

আলোকিত মানুষ তৈরির সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, আর শিক্ষাব্যবস্থা সেই আলোর বাতিঘরগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তিসরবরাহকারী ব্যবস্থা। বাতিঘরের কাজ পথিককে কোনো নির্দিষ্ট পথে টেনে নেওয়া নয়; বরং অন্ধকারের মধ্যে পথ চিনে নেওয়ার মতো আলো দেওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাজও তাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরি করা নয়; বরং মানুষকে এমন জ্ঞান, বিচারবোধ ও নৈতিক সাহস দেওয়া, যার মাধ্যমে সে নিজের পথ নিজেই চিনে নিতে পারে। ‘শিক্ষাব্যবস্থা’ নামক পাওয়ারহাউস বা শক্তিকেন্দ্র থেকে শক্তির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জাতি শুধু জ্ঞানের অন্ধকারেই হারিয়ে যায় না, হারিয়ে ফেলে তার বিবেক, দিকনির্দেশনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতাও। অতএব, আমাদের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল কতজনকে শিক্ষার আওতায় আনতে পেরেছি, তা নয়; বরং আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি। আমরা কি এমন প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে দ্বিধা করবে না, ভিন্নমতকে সম্মান করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকের কণ্ঠ শুনবে এবং নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবে? যদি উত্তরটি ‘হ্যাঁ’ করতে হয়, তবে শিক্ষাকে মুক্ত করতে হবে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি এবং দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির করালগ্রাস থেকে। শিক্ষাঙ্গনে যোগ্য ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চার সব পথ অবারিত রাখতে হবে। তখনই শিক্ষার আলো কেবল শ্রেণিকক্ষকে আলোকিত করবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আর সেই আলো জ্বলে উঠলে বাংলাদেশ তার ইতিহাসকে নতুন করে বুঝতে, বর্তমানকে বিবেক ও যুক্তির আলোকে মূল্যায়ন করতে এবং ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে নির্মাণ করতে সক্ষম হবে। ইতিহাস হবে আমাদের শিক্ষা, বাস্তবতা হবে আমাদের পরিকল্পনা ও এগিয়ে চলার ভিত্তি, আর মুক্ত ও আলোকিত ভবিষ্যৎ হবে আমাদের লক্ষ্য। সেই ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি আমাদেরই হাতের মুঠোয়। আর তার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো সুপরিকল্পিত ও মানসম্মত শিক্ষা; যে শিক্ষা মানবিক, নৈতিক ও ভবিষ্যতমুখী সুনাগরিক তৈরি করে।

শিক্ষা, রাজনীতি ও মুক্তবুদ্ধির সংকট: আলোকিত জাতি গঠনের পূর্বশর্ত- পর্ব ৩

* লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad