মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব শুধু মানসিক অস্বস্তিই তৈরি করে না, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও। তবে জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন এনে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
মানুষ ও পরিবেশের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণপেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. অ্যাঞ্জেলা ডাকওয়ার্থ তার নতুন বই ‘সিচুয়েটেড: ফাইন্ড দ্য পিপল অ্যান্ড প্লেসেস দ্যাট ব্রিং আউট ইয়োর বেস্ট’-এ মানুষের সাফল্য ও সামাজিক পরিবেশের সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।
তার মতে, মানুষের সাফল্যের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত চেষ্টা বা প্রেরণাই কাজ করে না। মানুষ কোন পরিবেশে বসবাস করছে, কাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং কী ধরনের সামাজিক সুযোগ পাচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক জীবনব্যবস্থা সব সময় শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে না।
প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোএকাকিত্ব কমানোর ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন নিয়ে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কল কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট যোগাযোগ সহজ করলেও এগুলো সব সময় বাস্তব সামাজিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ড. শেরি টার্কলের মতে, প্রযুক্তি অনেক সময় ঝুঁকি ছাড়াই বন্ধুত্ব বা ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি দিতে পারে। কিন্তু প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং অন্যের কাছে নিজেকে কিছুটা উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
ভিডিও কল ও অনলাইন কথোপকথন দূরে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখতে সহায়ক হলেও মানুষের সরাসরি উপস্থিতি এবং কোনো সামাজিক বা সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার অভিজ্ঞতার পূর্ণ বিকল্প নয়। একইভাবে, এআই চ্যাটবট মানুষের মতো উত্তর দিতে পারলেও তা প্রকৃত মানবিক সহমর্মিতার বিকল্প নয়।
ছোট যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণসামাজিক সম্পর্ক গড়তে সব সময় বড় কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। স্থানীয় কফি শপের কর্মীকে শুভেচ্ছা জানানো, লাইনে দাঁড়িয়ে পাশের ব্যক্তির সঙ্গে দু-একটি কথা বলা, শখের ক্লাসে অন্যদের সঙ্গে কথা বলা কিংবা কোনো দৌড়ের দলে যোগ দেওয়ার মতো ছোট উদ্যোগও সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে পারে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মনোবিজ্ঞানী ড. লিন বুফকার বলেন, এসব ছোট যোগাযোগ সব সময় গভীর বন্ধুত্বে রূপ নেবে না। তবে এগুলো মানুষকে একটি সামাজিক পরিবেশের অংশ হিসেবে অনুভব করতে সাহায্য করে এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
তিনি একাকিত্ব কমানোর এই চর্চাকে সামাজিক ‘পেশি’ শক্তিশালী করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বয়স ও ব্যস্ততার কারণে নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অভ্যাস কমে গেলেও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে তা আবার গড়ে তোলা সম্ভব।
স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা পেরিয়ে কৌতূহলী হওয়াএকাকিত্ব কাটাতে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি। অপরিচিত কারও সঙ্গে প্রথম কথা বলা কিংবা নিজে থেকে যোগাযোগ শুরু করা অস্বস্তিকর হতে পারে। তবে এটিকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা হিসেবে না দেখে নতুন কিছু জানার সুযোগ হিসেবে নিলে বিষয়টি সহজ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা অন্য মানুষের প্রতি কৌতূহলী হওয়ারও পরামর্শ দেন। সবার পছন্দ, মতামত বা অভিজ্ঞতা এক হবে—এমন নয়। বরং মতের অমিল থাকলেও অন্য ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা সম্পর্ক তৈরির সুযোগ বাড়াতে পারে।
কেউ কেন এমন একটি সিনেমা পছন্দ করেন, যেটি আপনার ভালো লাগে না, কিংবা কোনো বিষয়ে তার ভিন্ন মতের পেছনে কী অভিজ্ঞতা রয়েছে—এ ধরনের সাধারণ প্রশ্ন থেকেই কথোপকথন শুরু করা যায়। শুরুতেই ব্যক্তিগত বা গভীর প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই।
নিয়মিত ছোট ছোট যোগাযোগের এই অভ্যাস ধীরে ধীরে সামাজিক পরিসর বাড়াতে পারে এবং অপ্রত্যাশিত মানুষের সঙ্গেও অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)