চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, ব্যথা বা অন্য কোনো উপসর্গ ছাড়া সাধারণভাবে আঙুল ফোটানোর শব্দকে হাড় ক্ষয়ের লক্ষণ বলা যায় না। জোড়ার ভেতরে গ্যাসের বুদবুদ তৈরির সঙ্গে এই শব্দের সম্পর্ক রয়েছে।
জোড়ার ভেতরে কী থাকেশরীরের সচল জোড়াগুলো একটি বিশেষ ক্যাপসুলে আবৃত থাকে। এর ভেতরে থাকে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড বা তরল, যা জোড়ার নড়াচড়া সহজ করে এবং হাড়ের মধ্যকার ঘর্ষণ কমাতে সহায়তা করে। এই তরলে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্যাস দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।
কীভাবে হয় ‘ফট’ শব্দআঙুল বা কোনো জোড়া টেনে হঠাৎ প্রসারিত করলে জোড়ার ভেতরের চাপ দ্রুত কমে যায়। এতে সাইনোভিয়াল তরলে দ্রবীভূত গ্যাস থেকে মুহূর্তের মধ্যে একটি গ্যাস বুদবুদ তৈরি হতে পারে। এ প্রক্রিয়াকে ট্রাইবোনিউক্লিয়েশন বলা হয়।
জোড়ার ভেতরে এই আকস্মিক পরিবর্তনের সময়ই সাধারণত ‘ফট’ বা ‘কট’ ধরনের শব্দ শোনা যায়। অর্থাৎ, স্বাভাবিকভাবে আঙুল ফোটানোর শব্দকে হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণের ফল হিসেবে দেখা হয় না।
কেন সঙ্গে সঙ্গে আবার শব্দ হয় নাএকবার আঙুল ফোটানোর পর একই জোড়া সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোটানো যায় না। কারণ, তৈরি হওয়া গ্যাসীয় পরিবর্তন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পর একই জোড়ায় আবার শব্দ তৈরি হতে পারে।
সব ধরনের জোড়ার শব্দ স্বাভাবিক নয়জোড়া থেকে শব্দ হওয়া সবসময় ক্ষতিকর নয়। ব্যথা, ফোলা বা নড়াচড়ায় সমস্যা না থাকলে মাঝে মাঝে ‘ফট’ বা ‘কট’ শব্দ হওয়া সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়।
তবে শব্দের সঙ্গে ব্যথা, ফোলা, জোড়া আটকে যাওয়া, নড়াচড়ায় সীমাবদ্ধতা কিংবা আঘাতের ইতিহাস থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে কার্টিলেজের সমস্যা, লিগামেন্টের আঘাত, মেনিস্কাসের ক্ষতি, টেনডনের সমস্যা বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো জটিলতা থাকতে পারে।
আঙুল ফোটালে কি আর্থ্রাইটিস হয়?বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিয়মিত আঙুল ফোটানোর সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হওয়ার সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই শুধু আঙুল ফোটানোর কারণে হাড় ক্ষয় বা আর্থ্রাইটিস হবে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তবে জোর করে বা অতিরিক্তভাবে জোড়া টানাটানি করলে নরম টিস্যুতে অস্বস্তি বা সামান্য আঘাতের মতো সমস্যা হতে পারে। এ কারণে অপ্রয়োজনে বারবার জোড়া ফোটানোর অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ভালো।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেনজোড়া থেকে শব্দ হওয়ার পাশাপাশি নিচের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
ব্যথা বা ফোলা;
হাঁটা বা দৈনন্দিন কাজে সমস্যা;
জোড়া বারবার আটকে যাওয়া;
আঘাতের পর নতুন করে শব্দ শুরু হওয়া;
জোড়ায় অস্থিরতা বা দুর্বলতা অনুভূত হওয়া।
শেষ কথাআঙুল বা অন্য কোনো জোড়া থেকে ‘ফট’ শব্দ হলেই সেটিকে হাড় ক্ষয়ের লক্ষণ মনে করার কারণ নেই। ব্যথা, ফোলা বা নড়াচড়ায় সমস্যা না থাকলে এ ধরনের শব্দ অনেক ক্ষেত্রেই জোড়ার স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ।
তবে শব্দের সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে সেটিকে অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ তখন জোড়ার ভেতরে থাকা কোনো সমস্যা বা আঘাতের ইঙ্গিত থাকতে পারে।
তথ্যসূত্র: ডা. শেখ সাদীউল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি), জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), ঢাকা; জোড়ার শব্দ ও অস্টিওআর্থ্রাইটিস সম্পর্কিত চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)