মঞ্চ-পর্দার আড়ালে মুখে শিল্প আঁকার কারিগররা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৮ দুপুর
  • ২১৪৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
মঞ্চ কিংবা পর্দায় অভিনয়শিল্পীদের চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেকআপ আর্টিস্ট ও রূপসজ্জা শিল্পীরা। আলো-ঝলমলে আয়োজনের আড়ালে থাকা এসব শিল্পীর অনেকেই মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনযাপন করেও বছরের পর বছর অন্যের মুখে শিল্প নির্মাণ করে চলেছেন। কেউ এসেছেন শখে, কেউ শিল্পের টানে, আবার কারও পথচলা হয়েছে বংশপরম্পরায়। স্বীকৃতি পেয়েছেন কেউ কেউ; তবে অনেকেই পুরস্কার-সম্মান ছাড়াই নাটক, নৃত্য, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছেন।কাজ কমেছে, তবু থামেনি পথচলা

তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া মেকআপ আর্টিস্ট মোহাম্মদ আলী বাবুল ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে চলচ্চিত্রের মেকআপ শিল্পী শহীদ আলীর হাত ধরে এ পেশায় আসেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। চাষী নজরুল ইসলামের ওরা ১১ জন, নাসির উদ্দীন ইউসুফের গেরিলা এবং গাজী রাকায়েতের মৃত্তিকা মায়া চলচ্চিত্রে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

বর্তমানে উইগ তৈরি ও বিক্রির পাশাপাশি থিয়েটার, ওয়েব সিরিজ, টেলিফিল্ম ও ইউটিউবের বিভিন্ন কাজে যুক্ত আছেন বাবুল। তবে আগের তুলনায় কাজ অনেক কমেছে। ‘আরণ্যক’ নাট্যদলের সঙ্গেও যুক্ত তিনি এবং বিভিন্ন থিয়েটার দলের হয়ে মেকআপের কাজ করছেন।

মেকআপের পাশাপাশি শিক্ষার ওপর জোর

প্রায় পাঁচ দশক ধরে মেকআপ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শঙ্কর কুমার দাস। ১৯৭৭ সালে ঢাকায় এসে নাটক দেখা ও থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এ অঙ্গনে তার পথচলা শুরু। পরে অসংখ্য ধারাবাহিক ও একক নাটক এবং চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। সর্বশেষ হৃদি হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে কাজ করেন তিনি। বর্তমানে নিয়মিত টেলিভিশনে মেকআপের কাজ করছেন।

শঙ্কর জানান, তার পরিবারের কেউ এ পেশায় ছিলেন না। তার ছেলেও মেকআপের পেশায় না এসে অনলাইন এডিটিং, ক্যামেরা ও গ্রাফিক্সের মতো কাজে যুক্ত হয়েছেন।

নতুন প্রজন্মকে এ পেশায় আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মেকআপের কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা ও শিক্ষা জরুরি। শিক্ষার ঘাটতির কারণে এ পেশা পিছিয়ে পড়েছে। সম্মান পেতে হলে নিজেদেরও সেই যোগ্যতা তৈরি করতে হবে।

‘পরবর্তী প্রজন্ম আসুক, চাই না’

আশির দশকে মেকআপ আর্টিস্ট জনি সেনের এ অঙ্গনে পথচলা শুরু। চলচ্চিত্রের মেকআপ শিল্পী বাবুলের কাছে কাজ শেখার পর মঞ্চ ও নৃত্যশিল্পীদের সাজসজ্জার কাজে যুক্ত হন। পরে কৃতী সরকার, কালাম পীরসহ বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে কাজ করতে করতে নিজেই মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

কর্মজীবনের শুরুর দিকে দিনে ২০ টাকা পারিশ্রমিক পেতেন তিনি। পরে তা বেড়ে ৫০, ৭৫ ও ১৫০ টাকা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে মঞ্চনাটক ও নৃত্যানুষ্ঠানে মেকআপের কাজ করছেন। ‘থিয়েটার ফ্যাক্টরি’, ‘অনুস্বর’সহ বিভিন্ন দলের নাটকে কাজ করেছেন। চলচ্চিত্রেও সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন।

তবে চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় হতাশ জনি। মেকআপ শিল্পীদের মূল্যায়ন নিয়েও তার আক্ষেপ রয়েছে। তার ভাষ্য, বাংলাদেশে এ পেশার যথাযথ মূল্যায়ন নেই। ভারতে দলের সঙ্গে গিয়ে কাজ করার সময় শিল্পীদের আলাদাভাবে সম্মান জানানো হয়—এটিই তাদের কাছে বড় প্রাপ্তি।

বংশপরম্পরায় রূপসজ্জার সঙ্গে তন্ময়

রূপসজ্জা শিল্পী তন্ময়ের পথচলা পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। তার ঠাকুরদা সুরেশ দত্ত ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথমদিকের রূপসজ্জা শিল্পীদের একজন। তার বাবা ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের থিয়েটারের অন্যতম প্রধান রূপসজ্জা শিল্পী এবং রূপসজ্জাকরদের গুরু হিসেবে পরিচিত।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাবার হাত ধরে বিভিন্ন নাটকের রূপসজ্জার কাজে যুক্ত হন তন্ময়। ২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর দায়িত্ববোধ থেকে কাজটি আরও গভীরভাবে গ্রহণ করেন। পরে বিভিন্ন থিয়েটার দল তাকে বাবার শূন্যস্থান পূরণের দায়িত্ব দেয়।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার নাট্যদলের প্রযোজনা, শিশু-কিশোর নাটকসহ এক হাজারের বেশি প্রযোজনায় রূপসজ্জার কাজ করেছেন তিনি।

তন্ময়ের মতে, থিয়েটারের রূপসজ্জায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের যথেষ্ট সুযোগ নেই। গ্ল্যামার মেকআপের প্রশিক্ষণ থাকলেও থিয়েটারের রূপসজ্জা নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সীমিত। এ ঘাটতি পূরণে গত ১২ বছর ধরে বাবার মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে নিজ উদ্যোগে তিন দিনের রূপসজ্জা কর্মশালার আয়োজন করে আসছেন তিনি।

পেশা নয়, ভালো লাগার জায়গা

প্রায় দুই দশক ধরে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন জাহাঙ্গীর আলম। লালমনিরহাটে থাকাকালে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পরে ঢাকায় এসে বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ নিয়ে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।

থিয়েটার, টেলিভিশন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে মেকআপের কাজ করেছেন তিনি। পেশাটি আর্থিকভাবে খুব বেশি প্রতিষ্ঠিত না হলেও এ কাজের ওপরই তার জীবনযাপন নির্ভরশীল।

জাহাঙ্গীরের ভাষায়, তিনি একা মানুষ হওয়ায় বেশি আয়ের প্রয়োজন হয় না। থিয়েটার ও মিডিয়ার বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকলেও থিয়েটারেই তার কাজ বেশি। ভালো লাগা থেকেই এ শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত আছেন তিনি।

মেকআপ ও রূপসজ্জা শিল্পীরা নেপথ্যে থাকলেও অভিনয়শিল্পীর চরিত্র নির্মাণে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য। স্বীকৃতি ও আর্থিক নিশ্চয়তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এসব শিল্পীর প্রত্যাশা—তাদের সৃষ্টিশীল কাজই হয়ে উঠুক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad