কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নগরীতে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৭টি এবং চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৩০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরে সদর ও লবণচরা থানায় ছয়টি করে এবং নগরীর অন্যান্য থানায় ১৮টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রূপসায় ছেলে হত্যার মামলার বাদী বাবাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নগর ও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত সোমবার মাগরিবের নামাজের পর আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামের একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন আক্তার ঢালী। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে গত ১৫ আগস্ট আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় তাঁর বাবা আক্তার ঢালী বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল, স্ত্রীকে তালাক দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে শ্বশুরবাড়ির লোকজন জয়কে হত্যা করেছে।
পুলিশ বলছে, জয় ও তাঁর বাবা আক্তার ঢালী হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আক্তার ঢালী হত্যাকাণ্ডে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।
খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আনিসুজ্জামান বলেন, স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার বিরোধের জেরে প্রথমে জয় ঢালী এবং পরে তাঁর বাবা আক্তার ঢালী হত্যার শিকার হয়েছেন। আক্তার ঢালী হত্যাকাণ্ডে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পুলিশের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও স্থানীয় বিরোধের পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দখলকে কেন্দ্র করেও সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এসব বিরোধে সশস্ত্র অপরাধী চক্রের ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় খুলনা নগরীর আলোচিত অপরাধী গ্রুপ হিসেবে ‘বি-কোম্পানি’, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, বেজি আল-আমিন, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপের নাম রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডে এসব গ্রুপের সম্পৃক্ততা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কেএমপির সহকারী কমিশনার (অপরাধ) গোলাম মোহাম্মদ বলেন, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কেএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘সন্ত্রাসী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ তাঁর দাবি, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদককেন্দ্রিক বিরোধের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে পুলিশ কাজ করছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অপরাধীদের গ্রেপ্তারের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে পুলিশের অভিযান ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি থাকলেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। নগরীতে হত্যাকাণ্ডের কারণ চিহ্নিত করে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদক, চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্যকেন্দ্রিক বিরোধ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক