সরকারি অর্থ ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রচারণামূলক টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় কমিটি (ডিএনসি)। একই অভিযোগে গণতন্ত্রবিষয়ক পর্যবেক্ষক সংগঠন কমন কজও পৃথক মামলা করেছে।
বুধবার করা ডিএনসির মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনা বাড়াতেই সরকারি অর্থে এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান কেন মার্টিন অভিযোগ করেন, নভেম্বরে রিপাবলিকানদের শেষ মুহূর্তে সুবিধা করে দিতে ট্রাম্প লাখ লাখ করদাতার অর্থ ব্যবহার করে ‘খাঁটি প্রচারণামূলক’ বিজ্ঞাপন প্রচার করছেন।
কমন কজের মামলায়ও বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনগুলো কোনো জনসেবামূলক ঘোষণা নয়; বরং এগুলো সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারণা। সংগঠনটির দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থ ব্যবহারের ওপর যে আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে, এসব বিজ্ঞাপন তার লঙ্ঘন।
কংগ্রেসের বরাদ্দ অন্য খাতে ব্যবহারের অভিযোগদুই মামলাতেই অভিযোগ করা হয়েছে, ট্রাম্প হোয়াইট হাউসকে কংগ্রেসের বরাদ্দ করা ২ কোটি ডলার বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজে ব্যবহারের নির্দেশ দেন। ওই অর্থ সীমান্ত নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্মরণানুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ছিল। দায়িত্ব পালনকালে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এসব কার্যক্রম আয়োজনের কথা ছিল।
বাদীপক্ষের দাবি, কংগ্রেস নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যে অর্থ বরাদ্দ করেছে, তা ভিন্ন খাতে ব্যবহার করে ট্রাম্প সংবিধানে নির্ধারিত ক্ষমতার বিভাজন লঙ্ঘন করেছেন। কমন কজের মামলায় বলা হয়েছে, কংগ্রেস যে উদ্দেশ্যে অর্থ বরাদ্দ করে, নির্বাহী বিভাগ আইন অনুযায়ী সেই উদ্দেশ্যেই তা ব্যয় করতে পারে।
মামলায় করদাতাদের অর্থ ‘প্রচার বা প্রচারণার উদ্দেশ্যে’ ব্যবহার না করার বিধানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনগুলোকে বেআইনি ঘোষণা, এগুলোর পেছনে সরকারি অর্থ ব্যয় বন্ধ এবং ইতোমধ্যে ব্যয় করা অর্থ পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ডেমোক্রেটিক পার্টির মামলাটি করা হয়েছে ওয়াশিংটন ডিসিতে। আর কমন কজের মামলাটি নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে দায়ের করা হয়েছে।
১ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয়সেপ্টেম্বর থেকে এসব বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সমালোচনা চলছে। গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন ব্যয় পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিজ্ঞাপনগুলো প্রচারে ১ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে।
ট্রাম্পের বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহৃত ২ কোটি ডলার ছিল কংগ্রেসের বরাদ্দ করা ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের একটি প্যাকেজের অংশ। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে ওই অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
সমালোচকদের অভিযোগ, বিজ্ঞাপনগুলোর একটি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনী প্রচারের একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়।
এখন পর্যন্ত তিনটি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে। একটি বিজ্ঞাপনে ট্রাম্পের বিভিন্ন ছবি দেখানোর সময় একটি গায়কদল ‘লাভ মি’ গানটি গায়। সেখানে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ‘কখনোই কমিউনিস্ট দেশ হবে না’।
অন্য একটি বিজ্ঞাপনে মাউন্ট রাশমোরের ছবি ব্যবহার করে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘স্বর্ণযুগের’ কথা বলেন। তৃতীয় বিজ্ঞাপনে সাদা-কালো দৃশ্যে ট্রাম্প ক্যামেরার দিকে এগিয়ে এসে ‘ডিপ স্টেট’সহ কথিত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘চূড়ান্ত লড়াইয়ের’ সতর্কবার্তা দেন।
৮৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের আপত্তিবুধবার রয়টার্স ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসসের প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, বিজ্ঞাপনগুলোর জন্য সরকারি অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে মার্কিন জনগণের বড় অংশের আপত্তি রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, এসব বিজ্ঞাপনে সরকারি অর্থ ব্যবহার করা উচিত হয়নি। রিপাবলিকানদের মধ্যেও প্রতি পাঁচজনের চারজন একই মত দিয়েছেন।
ট্রাম্প অবশ্য বিজ্ঞাপনগুলোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এগুলোকে ‘দেশের প্রচার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং আগের প্রশাসনগুলোর প্রচারমূলক কর্মসূচির সঙ্গে এর মিল রয়েছে বলে দাবি করেছেন।
তবে দুই দলের সমালোচনার মুখে সোমবার ট্রাম্প জানান, ভবিষ্যতে আর কোনো বিজ্ঞাপনের জন্য করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করা হবে না। যদিও ইতোমধ্যে ব্যয় করা অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সদস্যও এসব বিজ্ঞাপনের সমালোচনা করেছেন। উত্তর ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেন, বিজ্ঞাপনগুলো সাবেক হাঙ্গেরীয় নেতা ভিক্টর অরবানের প্রচার করা বিজ্ঞাপনের মতো মনে হয়েছে।
অন্যদিকে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন একটি বিজ্ঞাপনের বার্তার সঙ্গে একমত হলেও বলেছেন, এর জন্য করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করা উচিত নয়।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স ও ইপসস।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক