অন্যদিকে ওপেনএআই বলেছে, গবেষণাটির পরীক্ষাপদ্ধতি বাস্তবে কিশোরদের জন্য চ্যাটজিপিটির নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা পুরোপুরি তুলে ধরে না।
কিশোরদের জন্য যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে ওপেনএআইচলতি বছরের আগস্টে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সি ব্যবহারকারীদের জন্য চ্যাটজিপিটিতে বেশ কিছু অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করে ওপেনএআই। এর লক্ষ্য ছিল কিশোরদের স্বাস্থ্যকরভাবে এআই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাড়ানো।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কিশোরদের এমন রোমান্টিক বা আবেগঘন কথোপকথন সীমিত করার কথা বলা হয়েছে, যা তাদের এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত আবেগগত নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে চ্যাটজিপিটি নিজেকে সচেতন বা চেতনাসম্পন্ন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে না। যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি ঠেকানো এবং সংবেদনশীল ছবি শেয়ার করলে কিশোরদের সতর্ক করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কোনো কিশোরের চ্যাটজিপিটি হিসাবের সঙ্গে অভিভাবকের হিসাব যুক্ত থাকলে আত্মহানি বা অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কথোপকথন হলে অভিভাবককে সতর্ক করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
ওপেনএআইয়ের দাবি, ব্যবহার পড়াশোনামুখীওপেনএআই জানিয়েছে, নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর পর কিশোরদের চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে পড়াশোনাকেন্দ্রিক প্রবণতা বেড়েছে। পড়াশোনায় সহায়তা নেওয়া এবং বিদ্যালয়ের কাজের বিষয়ে পরামর্শ নেওয়াই ব্যবহারের বড় অংশ।
কোম্পানিটির তথ্য অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটিতে একজন কিশোরের গড় ব্যবহার দিনে ১৫ মিনিটেরও কম। দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে বিরতি নেওয়ার জন্য স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়। এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রায় অর্ধেক কিশোর দ্রুত চ্যাটজিপিটি ব্যবহার বন্ধ করে দেয়।
এ ছাড়া টানা তিন ঘণ্টা বা তার বেশি সময় চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করা কিশোরদের ৮০ শতাংশের বেশি কথোপকথনে পড়াশোনা-সংক্রান্ত বিষয় ছিল বলে জানিয়েছে ওপেনএআই।
আত্মহানি নিয়ে সতর্কবার্তা নিয়ে প্রশ্নতবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কমন সেন্স মিডিয়ার গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আত্মহত্যা বা আত্মহানির মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কিশোরদের কথোপকথন শনাক্ত এবং অভিভাবকদের সতর্ক করার ব্যবস্থাসহ চ্যাটজিপিটির কয়েকটি নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করছে না।
গবেষণায় একাধিক হিসাব ব্যবহার করা হয়, যেগুলো কিশোর ব্যবহারকারীর নামে নিবন্ধিত ছিল। নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর আগে ও পরে এসব হিসাবের কথোপকথন পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকেরা দাবি করেন, নতুন তৈরি করা এবং অভিভাবকের সঙ্গে যুক্ত হিসাব থেকে আত্মহত্যার চিন্তা, আত্মহানি বা অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস নিয়ে এক ঘণ্টা পর্যন্ত কথোপকথন চালালেও কোনো অভিভাবকের কাছে সতর্কবার্তা যায়নি। তবে পুরোনো কিছু হিসাবে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কয়েক সপ্তাহের কথোপকথনের ইতিহাস থাকলে অভিভাবকের কাছে সতর্কবার্তা যাওয়ার ঘটনা দেখা গেছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, সংকটে থাকা কিশোরদের জরুরি সহায়তা নম্বর বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রেও চ্যাটজিপিটি সব সময় নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করেনি।
ওপেনএআইয়ের পাল্টা বক্তব্যকমন সেন্স মিডিয়ার গবেষণার পদ্ধতি পর্যালোচনা করে ওপেনএআইয়ের এক মুখপাত্র বলেন, গবেষণার বড় একটি অংশের পরীক্ষা অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই শুরু ও শেষ হয়ে থাকতে পারে।
ওপেনএআই কঠোর ও স্বাধীন মূল্যায়নকে স্বাগত জানায় উল্লেখ করে ওই মুখপাত্র বলেন, গবেষণাটি বাস্তবে কিশোরদের জন্য চ্যাটজিপিটির নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা সঠিকভাবে তুলে ধরে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে কিশোরদের সহায়তা করতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতও গবেষণায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
কমন সেন্সের যুব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিরাপত্তা ইনস্টিটিউটের প্রধান টম সিগেল অবশ্য বলেন, চ্যাটজিপিটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে কাজ করছে—এমন ধারণা অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এসব ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে কাজ করছে না।
বাড়ছে আইনি ও সামাজিক চাপশিশু-কিশোরদের অনলাইন আচরণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। আত্মহানি ও আত্মহত্যার মতো ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির অভিযোগে মেটা ও টিকটকসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।
কিশোরদের চ্যাটজিপিটি ব্যবহার নিয়েও ওপেনএআই বাড়তি নজরদারি ও আইনি চাপের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কানাডার প্রত্যন্ত টাম্বলার রিজ এলাকায় ১৮ বছর বয়সি এক তরুণ বন্দুক হামলায় জড়িত ছিল। হামলার আগে কয়েক মাস ধরে ওই তরুণ চ্যাটজিপিটিতে বন্দুক সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ওই ব্যবহারকারীর হিসাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সতর্কবার্তা হিসেবে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ওপেনএআই। ওই ঘটনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও চলছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক