একসময় একটি গুজব ছড়িয়ে দিতে সময় লাগত। এখন একটি স্মার্টফোনই যথেষ্ট। কেউ একটি দাবি করলেন, আরেকজন যাচাই না করেই সেটি শেয়ার করলেন। এরপর একই তথ্য বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একপর্যায়ে মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, এত জায়গায় যখন একই খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাহলে নিশ্চয়ই তা সত্য।
এভাবেই একটি মিথ্যা তথ্যও ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতা পেতে পারে। কখনো পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। কখনো অন্য দেশের ভিডিওকে বাংলাদেশের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়। আবার কোনো সত্য ঘটনার সঙ্গে মনগড়া তথ্য যুক্ত করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বয়ান তৈরি করা হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাড়ছে বিভ্রান্তির ঝুঁকিকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। লেখা, ছবি, শব্দ ও ভিডিও তৈরি থেকে শুরু করে তথ্য বিশ্লেষণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তবে প্রযুক্তিটির অপব্যবহারও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
এআই ব্যবহার করে বাস্তবের মতো ছবি তৈরি, কারও কণ্ঠস্বরের আদলে ভুয়া বক্তব্য তৈরি কিংবা একজনের মুখ অন্য ব্যক্তির ভিডিওতে বসিয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলেছেন বা এমন কাজ করেছেন—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।
ডিপফেকের ফাঁদএআই দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত বাস্তবসম্মত ছবি, ভিডিও ও অডিওকে সাধারণভাবে ডিপফেক বলা হয়। এর বড় সমস্যা হলো, অনেক সময় সাধারণ চোখে তা শনাক্ত করা কঠিন।
কোনো ব্যক্তির নামে ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সেটি দ্রুত মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষা, চাকরি ও পেশাগত জীবনে। বিশেষ করে নারীদের ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও কৃত্রিমভাবে তৈরি কিংবা পরিবর্তন করে ছড়িয়ে দেওয়া হলে ক্ষতির মাত্রা আরও গুরুতর হতে পারে।
আসল ছবি, মিথ্যা গল্পডিজিটাল বিভ্রান্তির একটি প্রচলিত কৌশল হলো সত্যিকারের ছবি ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো। একটি ছবি হয়তো পাঁচ বছর আগে কোনো স্থানে তোলা। সেটিই নতুন কোনো ঘটনার ছবি হিসেবে প্রচার করা হলো। এক্ষেত্রে ছবিটি সত্য হলেও এর সঙ্গে যুক্ত বর্ণনা মিথ্যা।
একইভাবে দীর্ঘ কোনো ভিডিও থেকে কয়েক সেকেন্ডের অংশ কেটে প্রচার করা হলে পুরো ঘটনার অর্থ বদলে যেতে পারে। তাই কোনো ছবি বা ভিডিও দেখেই বিশ্বাস না করে এর সময়, স্থান, মূল উৎস ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি বড় সমস্যা হলো আগাম বিচার বা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে, তদন্ত হতে পারে, মামলা হতে পারে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা ন্যায়সংগত নয়।
বিশেষ করে অপরাধসংক্রান্ত সংবাদে অভিযোগ, তদন্ত, মামলা ও আদালতে প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য আদালতের রায়ের বিকল্প হতে পারে না।
ভুল তথ্যের শিকার হন বাস্তব মানুষযাচাইহীন তথ্যের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় যখন তা কোনো বাস্তব মানুষের জীবনে আঘাত হানে। মিথ্যা অভিযোগে কারও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে, পারিবারিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে এবং চাকরি, ব্যবসা বা পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অনলাইনে ধারাবাহিক অপমান, হুমকি ও হয়রানির কারণে কেউ গুরুতর মানসিক সংকটেও পড়তে পারেন। তাই অনলাইনে কাউকে অপমান করা কিংবা যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়াকে নিছক বিনোদন বা মজা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেউ এমন সংকটে পড়লে তাকে একা না রেখে পরিবার, বিশ্বস্তজন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
পোস্ট মুছে ফেললেই ক্ষতি মুছে যায় নাভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার পর মূল পোস্টটি মুছে ফেললেও এর প্রভাব সবসময় শেষ হয় না। এরই মধ্যে কেউ সেটির স্ক্রিনশট নিতে পারেন, ছবি বা ভিডিও ডাউনলোড করে রাখতে পারেন কিংবা অন্য প্ল্যাটফর্মে পুনরায় প্রকাশ করতে পারেন। ফলে একটি মিথ্যা তথ্য মূল পোস্টের চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ কারণে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর সংশোধন করা জরুরি হলেও তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শেয়ার বা প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করা।
ফ্যাক্টচেকের বিকল্প নেইকোনো তথ্য দেখলেই প্রথমে এর মূল উৎস, প্রকাশের সময়, ঘটনার স্থান ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই তথ্য একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠিত উৎসে প্রকাশিত হয়েছে কি না, সেটিও দেখা দরকার।
ছবি হলে বিপরীত ছবি অনুসন্ধানের মাধ্যমে এর পুরোনো উৎস খোঁজা যায়। ভিডিওর ক্ষেত্রে মূল ভিডিও বা পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ খুঁজে দেখা জরুরি। কারও বক্তব্য উদ্ধৃত হলে তার পূর্ণ ভিডিও, লিখিত বক্তব্য বা মূল নথি পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা উচিত। সম্ভব হলে একাধিক স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য উৎসের তথ্য মিলিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই নিরাপদ।
ভাইরাল পোস্ট সূত্র হতে পারে, প্রমাণ নয়ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুলতা নিশ্চিত করা। কোনো পোস্ট ভাইরাল হয়েছে বলেই সেটিকে সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ হতে পারে না। ভাইরাল পোস্ট অনুসন্ধানের সূত্র হতে পারে, কিন্তু সেটিই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, সরকারি নথি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিরোনামেও অতিরঞ্জন পরিহার করা জরুরি। কারণ অনেক পাঠক পুরো সংবাদ না পড়ে শুধু শিরোনাম দেখেই একটি বিষয়ে ধারণা তৈরি করেন।
তাই তথ্যের গতি যতই বাড়ুক, সত্য যাচাইয়ের দায়িত্ব ততই গুরুত্বপূর্ণ। ভাইরাল হওয়া কোনো তথ্যের সত্যতার প্রমাণ নয়; সত্যতা নির্ভর করে তথ্যের উৎস, প্রমাণ, প্রেক্ষাপট ও স্বাধীন যাচাইয়ের ওপর।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)