গবেষণাটি The Astrophysical Journal Letters-এ প্রকাশিত হয়েছে। এর প্রধান লেখক সৌরভ পল। সহলেখক হিসেবে রয়েছেন ঝাওটিং চেন, মারিও জি. সান্তোস ও লরা ভলজ।
২১ সেন্টিমিটারের ক্ষীণ সংকেতমহাবিশ্বের অন্যতম মৌলিক ও প্রাচুর্যপূর্ণ উপাদান নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন। নির্দিষ্ট একটি ভৌত প্রক্রিয়ায় এই হাইড্রোজেন প্রায় ২১ সেন্টিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেতার বিকিরণ নির্গত করে। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে এই সংকেত পৃথিবীর দিকে আসার সময় মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণে এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দীর্ঘ হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় রেডশিফট।
রেডশিফটের মাত্রা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করতে পারেন, সংকেতটি মহাবিশ্বের কোন সময়পর্ব থেকে এসেছে। এবারের গবেষণায় ০.৩২ ও ০.৪৪ রেডশিফটের দুটি অঞ্চলে নিরপেক্ষ হাইড্রোজেনের সংকেতের পাওয়ার স্পেকট্রাম পরিমাপ করা হয়েছে।
সংকেত শনাক্ত ছিল বড় চ্যালেঞ্জএত দূর থেকে আসা ২১ সেন্টিমিটারের সংকেত অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় তা শনাক্ত করা ছিল কঠিন। মহাকাশের উজ্জ্বল বেতার উৎসের পাশাপাশি মানুষের তৈরি রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি ইন্টারফেরেন্স বা RFI এবং টেলিস্কোপের নিজস্ব যন্ত্রগত প্রভাবও এই সংকেতকে আড়াল করতে পারে।
গবেষকরা এসব বাধা পেরিয়ে রেডিও পর্যবেক্ষণ-তথ্য থেকে হাইড্রোজেনের ক্ষীণ সংকেত আলাদা করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ জন্য দৃশ্যমান আলোর আলাদা কোনো ছায়াপথ জরিপের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। অর্থাৎ প্রতিটি ছায়াপথ পৃথকভাবে শনাক্ত না করেও হাইড্রোজেনের সামগ্রিক বণ্টন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
দ্রুত তৈরি হবে মহাবিশ্বের ত্রিমাত্রিক মানচিত্রএই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হাইড্রোজেন ইনটেনসিটি ম্যাপিং’ পদ্ধতির প্রয়োগ। প্রচলিত পদ্ধতিতে দূরবর্তী ছায়াপথগুলো একে একে শনাক্ত করে তাদের অবস্থান নির্ণয় করা হয়। এতে বিপুল সময় ও পর্যবেক্ষণ-তথ্যের প্রয়োজন পড়ে।
ইনটেনসিটি ম্যাপিংয়ে নির্দিষ্ট কোনো ছায়াপথ আলাদাভাবে শনাক্ত করার পরিবর্তে বিশাল মহাজাগতিক অঞ্চলে থাকা বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেনের সম্মিলিত বেতার বিকিরণ পরিমাপ করা হয়। এতে তুলনামূলক দ্রুত বৃহৎ পরিসরে হাইড্রোজেনের বণ্টন বোঝা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামোর একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির পথ আরও সুগম হতে পারে।
গবেষণায় যে কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তা মেগাপার্সেক পর্যায়ের—অর্থাৎ কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষজুড়ে বিস্তৃত। এই মাত্রার মহাজাগতিক কাঠামো বিশ্লেষণ মহাবিশ্বের বৃহৎ পরিসরের গঠন ও বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো তথ্যেই নতুন আবিষ্কারগবেষণাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এর জন্য নতুন করে সংগৃহীত কোনো পর্যবেক্ষণ-তথ্য ব্যবহার করা হয়নি। ২০১৮ সালে MeerKAT-এর প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের সময় সংগৃহীত তথ্য পুনরায় বিশ্লেষণ করে এই ফল পাওয়া গেছে।
তৎকালীন পর্যবেক্ষণের মূল লক্ষ্য ইনটেনসিটি ম্যাপিং ছিল না। তবে আধুনিক অ্যালগরিদম ও উন্নত ডেটা-প্রসেসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরোনো তথ্যের মধ্য থেকেই হাইড্রোজেনের এই ক্ষীণ সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ছায়াপথের জন্ম-বিবর্তন বোঝার সুযোগনিরপেক্ষ হাইড্রোজেনকে ছায়াপথ গঠন ও বিবর্তনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মহাবিশ্বের বিভিন্ন সময়ে এই হাইড্রোজেন কোথায় এবং কীভাবে ছড়িয়ে ছিল, তা জানা গেলে প্রথম দিকের ছায়াপথ কীভাবে গঠিত হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে—সে সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরের রেডিও পর্যবেক্ষণ ও উন্নত ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে হাইড্রোজেন ইনটেনসিটি ম্যাপিং মহাবিশ্বের বিবর্তন, বৃহৎ কাঠামো এবং ছায়াপথ গঠনের ইতিহাস অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: The Astrophysical Journal Letters; MeerKAT রেডিও টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ-তথ্য; গবেষণায় যুক্ত আন্তর্জাতিক গবেষক দল।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)