মুসলিম বিশ্বে মার্কিন বিনোদনের আধিপত্য, চাপে নিজস্ব সংস্কৃতি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪১ দুপুর
  • ৫৫৫৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
মুসলিম বিশ্বে মার্কিন বিনোদনশিল্পের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। টেলিভিশন অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র, ভিডিও গেম ও ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তারের সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে বিনোদনের ধরন। এতে পরিবারকেন্দ্রিক আনন্দচর্চা, স্থানীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক যোগাযোগ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, বিনোদন কি কেবল ভোগের পণ্য, নাকি মানুষের সৃজনশীলতা, পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বিকাশেরও মাধ্যম?

‘মুসলিমস অ্যান্ড দ্য প্রবলেম অব মডার্ন এন্টারটেইনমেন্ট’ শীর্ষক এক নিবন্ধে লেখক ইউসুফ আল-খাব্বাজ আধুনিক বিনোদনের বাণিজ্যিকীকরণ, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব এবং মুসলিম সমাজে নিজস্ব বিনোদনচর্চার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিনোদনকে শুধু নিষিদ্ধ বা অনুমোদনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে এর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে ভাবা জরুরি।

বিনোদন যখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের পণ্য

একসময় বিনোদন ছিল মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, আতিথেয়তা ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবারে গল্প বলা, একসঙ্গে সময় কাটানো, গান, শিল্পচর্চা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মানুষ আনন্দ ভাগাভাগি করত। অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীভেদে এসব চর্চার ধরনেও ছিল বৈচিত্র্য।

কিন্তু আধুনিক গণমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে বিনোদনের ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন বিনোদনের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। এসব অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র, গেম ও অন্যান্য কনটেন্ট বিশ্ববাজারে পণ্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে মানুষের অবসরযাপনের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দূরবর্তী নির্মাতা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, অস্ত্রের বাইরে বিনোদনও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলোর একটি। এ কারণে মার্কিন বিনোদনশিল্পের প্রভাবকে শুধু রুচি বা শিল্পমানের বিবেচনায় দেখলে চলবে না; এর অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনে কমছে পারিবারিক যোগাযোগ

আধুনিক পরিবারে একই ছাদের নিচে থেকেও সদস্যদের বিনোদনের জগৎ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। শিশুরা ভিডিও গেমে ব্যস্ত, কেউ টেলিভিশন দেখছেন, কেউ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাচ্ছেন। ফলে একসঙ্গে আনন্দ উপভোগ ও সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমে আসতে পারে।

নিবন্ধে এ প্রবণতাকে গণমাধ্যম ও বিপণনব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির দর্শকের জন্য আলাদা কনটেন্ট তৈরি করে তাদের পৃথক ভোক্তাগোষ্ঠীতে ভাগ করা হয়। বিপণনের ভাষায় এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অডিয়েন্স সেগমেন্টেশন’।

এর ফলে বিনোদন ব্যক্তিগত পর্দাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, অথচ পরিবার ও সমাজের সদস্যদের একত্র করার ক্ষমতা হারাচ্ছে। লেখকের মতে, বিনোদনের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনায় তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে রাখা প্রয়োজন—কোন ধরনের বিনোদন মানুষকে কাছাকাছি আনে, আর কোনটি তাদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে?

মার্কিন সংস্কৃতির অনুকরণেই কি সমাধান?

মুসলিম বিশ্বে নিজস্ব বিনোদনশিল্প গড়ে তোলার কথা প্রায়ই বলা হয়। তবে মার্কিন অনুষ্ঠানকে স্থানীয় ভাষায় উপস্থাপন কিংবা পশ্চিমা বিনোদনের অনুকরণ করলেই যে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নয়।

নিবন্ধে আরব বিশ্বের বিভিন্ন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, পশ্চিমা বিনোদনের বহু ধরন স্থানীয় পরিসরেও ছড়িয়ে পড়েছে। রিয়েলিটি টিভি, ধারাবাহিক নাটক ও পরিস্থিতিনির্ভর কৌতুক অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা এর উদাহরণ।

লেখকের পর্যবেক্ষণ, এসব অনুষ্ঠানের স্থানীয় সংস্করণ অনেক সময় মূল ধারার বিনোদনের অনুকরণেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে নিজস্ব সমাজের ইতিহাস, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

তাই বিকল্প বিনোদন তৈরির অর্থ কেবল পশ্চিমা কনটেন্টের মুসলিম সংস্করণ নির্মাণ নয়। বরং স্থানীয় ঐতিহ্য, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্বতন্ত্র সৃজনশীল ধারা গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।

সংগীত ও ভিডিও গেম নিয়ে বিতর্কের বাইরে

মুসলিম সমাজে সংগীত, ভিডিও গেম ও অন্যান্য আধুনিক বিনোদন নিয়ে ধর্মীয় ও নৈতিক বিতর্ক রয়েছে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন আলেমের মতামতেও পার্থক্য দেখা যায়। তবে নিবন্ধটির বক্তব্য হলো, বিনোদন নিয়ে আলোচনা শুধু কোনো মাধ্যমের অনুমোদন বা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে বৃহত্তর সামাজিক সমস্যাটি আড়ালে থেকে যেতে পারে।

বিনোদনের ধরন, উদ্দেশ্য এবং মানুষের জীবনে তার প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার নিজেই আলোচনার একমাত্র বিষয় নয়; বরং মানুষ কেন নির্দিষ্ট ধরনের বিনোদনের প্রতি নির্ভরশীল হচ্ছে, তা-ও বোঝা জরুরি।

লেখকের মতে, আধুনিক জীবনযাপন ও শিক্ষাব্যবস্থার কিছু প্রবণতা মানুষকে নিজেরা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে অন্যের তৈরি পণ্য ও সেবার ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে। এ কারণে বিনোদনের বিকল্প খুঁজতে হলে আত্মবিশ্লেষণ ও স্বাধীন চিন্তার চর্চাও বাড়াতে হবে।

নিজস্ব বিনোদনচর্চায় ফিরতে হবে

গণমাধ্যমনির্ভর বিনোদনের বিকল্প হিসেবে পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন লেখক। তাঁর মতে, মানুষের আনন্দ উপভোগের স্বাভাবিক প্রবণতাকে বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল না রেখে সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক কাজে যুক্ত করা সম্ভব।

পরিবারে গল্প বলা, একসঙ্গে বই পড়া, ছবি আঁকা, আলোকচিত্রের চর্চা, সংগীত ও অন্যান্য শিল্পকর্মে অংশ নেওয়া হতে পারে এমন বিকল্পের অংশ। এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য শুধু অবসর কাটানো নয়; বরং মানুষের সৃজনশীলতা বিকাশ, পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা।

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মুসলিম সমাজে অলংকরণ, দৃশ্যশিল্প, সংগীত ও পরিবেশনাশিল্পের নানা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। এসব চর্চাকে নতুন প্রজন্মের কাছে অর্থবহভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিসর আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব বলে নিবন্ধে মত দেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হলে বিনোদন আবারও সামাজিক বন্ধন ও সৃজনশীলতার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষায় নতুন ভাবনা জরুরি

মার্কিন বিনোদনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিকে নিবন্ধে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ গণমাধ্যমে উপস্থাপিত পশ্চিমা জীবনধারার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। তবে পর্দায় দেখানো জীবন সব সময় বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা নাটকীয় ও বাণিজ্যিকভাবে নির্মিত উপস্থাপনা।

লেখকের মতে, সুখকে ভোগ্যপণ্যের সঙ্গে যুক্ত করা, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের ধারণা প্রচার করা আধুনিক বিনোদনের কিছু উল্লেখযোগ্য প্রবণতা। এসব উপস্থাপনা স্থানীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।

তবে শুধু বিদেশি বিনোদন বর্জনের আহ্বান দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিকল্প সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা, পারিবারিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের ভিত্তিতে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।

সব মিলিয়ে, বিনোদনকে নিছক সময় কাটানোর উপকরণ কিংবা বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে না দেখে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জীবনে এর ভূমিকা নতুন করে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে নিবন্ধে। নিজস্ব সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার চর্চা বাড়ানো গেলে মুসলিম সমাজের পক্ষে বৈশ্বিক বিনোদনশিল্পের নিষ্ক্রিয় ভোক্তা হয়ে থাকার প্রবণতা কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র: ইউসুফ আল-খাব্বাজের Muslims and the Problem of Modern Entertainment শীর্ষক নিবন্ধ। প্রকাশনা: Crescent International-এর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ICIT Digital।

মূল নিবন্ধ: crescent.icit-digital.org




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad