কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের ফলে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ ও কালোজিরার উৎপাদন বেড়েছে। আমদানিনির্ভর জিরা উৎপাদনেও শুরু হয়েছে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকায় মসলা খাতে আমদানির চাপ এখনো রয়ে গেছে।
কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উন্নত জাত, মানসম্মত বীজ, আধুনিক চাষাবাদ এবং উৎপাদনোত্তর ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে এ খাতে কৃষকের আয় ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
পেঁয়াজ-রসুনের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ মো. মাসুদুর রহমান আমার দেশকে জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে আদার উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৪৭ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার টনে। একই সময়ে পেঁয়াজের উৎপাদন ৩৪ লাখ ৫৬ হাজার টন থেকে বেড়ে ৫০ লাখ ৯১ হাজার টনে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া রসুনের উৎপাদন ৬ লাখ ৪১ হাজার টন থেকে বেড়ে ৮ লাখ ৪৮ হাজার টন, হলুদের উৎপাদন ১ লাখ ৫৮ হাজার টন থেকে ১ লাখ ৫৯ হাজার টন এবং কালোজিরার উৎপাদন ১২ হাজার টন থেকে বেড়ে ১৩ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
উৎপাদন বাড়লেও সব ধরনের মসলায় দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে জিরা, এলাচ, দারুচিনি ও লবঙ্গের মতো মসলার বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
জিরা চাষে নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বে প্রায় ১০৯ ধরনের মসলা থাকলেও বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয় প্রায় ৫০ ধরনের। এর মধ্যে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ ও ধনিয়া উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে জিরাসহ কয়েকটি মসলা আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে দেশকে।
এ পরিস্থিতি বদলাতে ‘বারি জিরা-১’ মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০টি জেলায় জিরার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে ৬০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাষের জন্য প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৩০ কৃষককে প্রশিক্ষণ ও বীজ সরবরাহ করা হয়েছে।
কৃষিবিদদের মতে, জিরা চাষের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা যাচাইয়ে একাধিক মৌসুমের ফলন, উৎপাদন ব্যয়, রোগবালাই, আবহাওয়ার উপযোগিতা ও বাজারদর পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
উৎপাদন বাড়ালেই কমবে না আমদানিনির্ভরতা
মসলা উৎপাদনে অগ্রগতি ধরে রাখতে ফসল সংগ্রহের পর শুকানো, বাছাই, গ্রেডিং, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ব্যবস্থার ঘাটতিতে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।
তাঁদের মতে, ফসলভিত্তিক চাহিদা, উৎপাদন ঘাটতি, আমদানির পরিমাণ ও অঞ্চলভিত্তিক কৃষি-উপযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা করতে হবে। পাশাপাশি মানসম্মত বীজ ও রোপণ উপকরণের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমনে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
উৎপাদন এলাকায় সংরক্ষণাগার, শুকানোর ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও জোর দিয়েছেন তাঁরা। কৃষক, পাইকার, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো গেলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ও সরবরাহ পরিকল্পনা সহজ হবে।
এ ছাড়া গুঁড়া ও মিশ্র মসলা, আদা-হলুদের গুঁড়া, রসুনের পেস্ট ও গুঁড়া এবং মরিচের গুঁড়ার মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, উন্নত প্যাকেজিং, পরীক্ষাগারভিত্তিক মান যাচাই ও রপ্তানি মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি।
পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের সম্ভাবনা দেখছেন অর্থনীতিবিদ
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম আমার দেশকে বলেন, দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে। সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এবং আগামী দুই থেকে চার বছর উৎপাদনের এ ধারা অব্যাহত থাকলে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।
তিনি বলেন, রসুনের উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে আদা ও অন্যান্য মসলাজাতীয় ফসল চাষেরও ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। প্রযুক্তির ব্যবহার ও ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে আদার উৎপাদন ইতোমধ্যে বেড়েছে।
তবে উৎপাদনের এ অগ্রগতি ধরে রাখতে প্রকল্প একবার নিয়ে বন্ধ না করে নিয়মিত ও সম্প্রসারিত আকারে চালু রাখার পরামর্শ দেন তিনি। কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করতে প্রকল্প সহায়তা, উদ্বুদ্ধকরণ ও ভর্তুকি অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন এ অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর ধীরে ধীরে প্রকল্প সহায়তা কমানো যেতে পারে।
২০২২ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়নাধীন মসলা উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা বিবেচনায় দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে মেয়াদ ও বরাদ্দ বাড়িয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যভিত্তিক আমদানি-রপ্তানি পরিসংখ্যান এবং মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের তথ্য

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)