পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে সড়কে প্রাণ গেল মাইশার, নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ দুপুর
  • ৬০১৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী মাইশা মুশফিরাত। উচ্চশিক্ষা শেষ করে মায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষার্থী। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছয় দফা দাবি জানিয়ে তাঁরা সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডালাস পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকজন শিক্ষার্থী মহাসড়কের পাশে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় যাত্রী ওঠানোর জন্য ধীরগতিতে চলা চট্টগ্রামমুখী ৮ নম্বর রুটের একটি লোকাল বাসকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় একটি ভারী লরি। এতে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। বাসের নিচে চাপা পড়ে মাইশাসহ কয়েকজন আহত হন।

পরে স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে সকাল ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রাজিয়া আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বহিরাগত আরও একজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোস্তাক খন্দকার জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজন সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় একটি লরি বাসটিকে ধাক্কা দিলে সেটি উল্টে তাঁদের ওপর পড়ে। এতে গুরুতর আহত মাইশার মৃত্যু হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নুরুল আলম আশেক জানান, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মাইশাকে সকাল ১১টার দিকে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের ভরসা ছিলেন মাইশা

মাইশার বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটতকিয়া এলাকায়। প্রায় তিন বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা। এরপর মা সালমা আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। পরিবারের বড় সন্তান মাইশাই ছিলেন মায়ের অন্যতম ভরসা।

মাইশা চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, মায়ের কষ্ট লাঘব করা এবং ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিদিনের মতো বাসের অপেক্ষায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মাইশা। কিন্তু একটি লরির ধাক্কায় উল্টে যাওয়া বাসের নিচে চাপা পড়ে শেষ হয় তাঁর জীবনযাত্রা।

মেয়ের মৃত্যুর খবরে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে মেয়েকে ঘিরে স্বামী হারানোর কষ্ট ভুলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন মা সালমা আক্তার, সেই মেয়েকেও হারাতে হলো তাঁকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস স্থগিত, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবারের ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করে। উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদী ও উপউপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসমত আলী হাসপাতালে গিয়ে আহত ও নিহত শিক্ষার্থীর বিষয়ে খোঁজ নেন।

এদিকে, মাইশার মৃত্যুর প্রতিবাদ এবং সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে সীতাকুণ্ডে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আইআইইউসির শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বানে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এতে সংশ্লিষ্ট সড়ক ও রেলপথে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীত পাশের মহাসড়কে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় কার্যকর নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে মহাসড়কে নিরাপদ যাতায়াতের প্রশ্ন। মাইশার পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁর মৃত্যু সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালো করেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad