পোশাকশিল্পের সংকট নিরসনে ১৫ দফা দাবি জামায়াতের, মজুরি বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৫০ দুপুর
  • ১০৪২৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার দাবি; ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকরের প্রস্তাব

দেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংকট নিরসনে ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকরের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে নবগঠিত মজুরি বোর্ডে প্রধান বিরোধী দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্ব না থাকায় বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব দাবি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার বলেন, পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি শুধু শ্রমিক-মালিক বিরোধ নয়; এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সংকট।

মজুরি বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

নবগঠিত মজুরি বোর্ডের গঠন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বোর্ডে সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় প্রতিনিধিদের রাখা হলেও প্রধান বিরোধী দলের কোনো প্রতিনিধি কিংবা বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। অথচ সংগঠনটি সহস্রাধিক ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব করে বলে দাবি করেন তিনি।

বোর্ডে শ্রমিক দল ও দলীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সব পক্ষের সম্মিলিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর মতে, শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ছাড়া মজুরি বোর্ডের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়।

তিনি বলেন, সাবেক বিরোধীদলীয় আন্দোলনকারী এক নেতা, যিনি বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী, আগে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২০ হাজার টাকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জামায়াত আশা করে, নতুন মজুরি বোর্ড শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য সুপারিশ করবে।

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি

গোলাম পরওয়ার বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের ব্যয় বাড়লেও শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বর্তমান আয়ে অনেক শ্রমিকের পক্ষে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

পোশাকশ্রমিকেরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁর শ্রমের অধিকার। শ্রমিকদের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তৌফিকের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি জানান, তৌফিক শেখ (২১) নামের এক শ্রমিক গুরুতর আহত হওয়ার পর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি করেন তিনি।

তৌফিকের মৃত্যুর কারণ, ঘটনার পরিস্থিতি এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার। পাশাপাশি আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের নিন্দা, উসকানির তদন্ত দাবি

শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এসব ঘটনায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, মালিকদের বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিকলীগসহ কোনো রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল বা অন্য গোষ্ঠী উসকানি কিংবা নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি। তবে প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী না করার আহ্বান জানিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার কথা বলেন।

একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলন দমনের নামে হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তার বন্ধ এবং নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান গোলাম পরওয়ার।

ত্রিপক্ষীয় সংলাপের আহ্বান

শিল্পের সংকট নিরসনে সরকারকে কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজন করতে হবে। পারস্পরিক আলোচনা, আস্থা ও সমঝোতার ভিত্তিতেই সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব।

এ ছাড়া বন্ধ কারখানা দ্রুত চালু, অন্যায়ভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, বকেয়া বেতন-ভাতা ও ওভারটাইম পরিশোধ এবং কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয় পর্যালোচনা করে পুনরায় কাজে ফেরানোর দাবি জানায় দলটি। শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নারী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার কথাও ১৫ দফায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতি

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. আবদুর রব ও অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন; ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আতিকুর রহমান, উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার এবং দক্ষিণের সহকারী প্রচার সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার সুমনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

তথ্যসূত্র: ৫ নভেম্বর ২০২৬, রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জরুরি সংবাদ সম্মেলন; দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য ও লিখিত ১৫ দফা দাবি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad