পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত বরাদ্দ কমিয়ে ব্যয় প্রাক্কলন যৌক্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রকল্পে অর্থায়ন ও মেয়াদ
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ১২১ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ ২ হাজার ৬৫৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। প্রকল্পের প্রস্তাবিত মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। পিইসি সভায় তা পরিবর্তন করে ২০২৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০৩০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুরোনো দর ধরে ব্যয় প্রাক্কলন
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির বহরে বর্তমানে ১ হাজার ২৮২টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৬৯৫টির বয়স ৩০ বছরের বেশি। বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি নিয়ে চলাচল করছে ৬৮১টি ক্যারেজ। একটি ক্যারেজের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ৩৫ বছর হওয়ায় পুরোনো বগিগুলো বদলে নতুন ক্যারেজ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
তবে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে প্রায় সাত বছর আগের বাজারদর অনুসরণ করায় আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ক্যারেজ, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের ব্যয় প্রাক্কলনে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়িত ১৫০টি মিটারগেজ ক্যারেজ প্রকল্পের ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবরের মূল্যতালিকা অনুসরণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি যোগ করা হয়েছে। রিলিফ ক্রেনের ব্যয় নির্ধারণেও এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়িত অন্য একটি প্রকল্পের বাজারদর বিবেচনা করা হয়েছে।
পিইসি সভায় বর্তমান বাজারদর যাচাই করে যৌক্তিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নতুন করে ব্যয় প্রাক্কলন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঋণের সম্মতিপত্র ও পরামর্শক নিয়োগে আপত্তি
প্রকল্পে এডিবির ঋণের কথা উল্লেখ থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও ঋণদাতা সংস্থার সম্মতিপত্র ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি। সভায় ইআরডির প্রতিনিধি ঋণ অর্থায়নের নিশ্চয়তার কথা জানালেও ঋণটি নন-কনসেশনাল বা কঠিন শর্তের হবে বলে উল্লেখ করেন। এ কারণে ইআরডির সম্মতিপত্র যুক্ত করে ডিপিপি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনটি উপাদানের জন্য পৃথক পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব থাকলেও মিটারগেজ ক্যারেজ-সংক্রান্ত পরামর্শক খাত বাদ দিয়ে বাকি দুটি কাজ একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। প্রি-শিপমেন্ট পরিদর্শন ফি নির্ধারণের ভিত্তিও ব্যাখ্যা করতে হবে।
আনুষঙ্গিক ব্যয়ে বড় কাটছাঁট
প্রকল্পের বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচেও কাটছাঁটের নির্দেশ দিয়েছে পিইসি। বিজ্ঞাপনের ১৬টি প্যাকেজ কমিয়ে সাতটি এবং বরাদ্দ ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। স্টেশনারি কেনার ব্যয় ২০ লাখ থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা, জরিপ ফি ৭৫ লাখ থেকে কমিয়ে ৪৫ লাখ টাকা এবং ভ্রমণ ব্যয় ২৫ লাখ থেকে কমিয়ে ২ লাখ টাকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনার খাত এবং প্রস্তাবিত টেস্টিং ফি বাদ দিতে বলা হয়েছে।
পরিবহন ব্যয়ের ক্ষেত্রে শুধু ট্রেইলার, লোডিং ও আনলোডিংয়ের খরচ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেলের মালামাল পরিবহনের প্রস্তাবিত ব্যয় বাদ দিতে হবে। দুটি ফোর হুইলার গাড়ি কেনার পরিবর্তে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া নেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
এ ছাড়া ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং প্রাইস কন্টিনজেন্সি ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। ক্যারেজ ও মালামাল বন্দরে রাখার চার্জ পোর্ট রেট অনুযায়ী নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের জনবল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারণ, কমিটি ও সভার সংখ্যা বিবেচনায় সম্মানী খাতের ব্যয় প্রাক্কলন এবং উৎসব খাত বাদ দেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছে পিইসি।
সভায় এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে দ্রুত সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ফলে পুরোনো ক্যারেজ বদলে নতুন বগি সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ব্যয় প্রাক্কলন ও অন্যান্য অসংগতি দূর না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির অনুমোদনের সুপারিশ চূড়ান্ত হচ্ছে না।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক