অন্ধকারে চারপাশ স্পষ্ট দেখা যায় না। ফলে পরিচিত কোনো শব্দ বা ছায়াকেও মস্তিষ্ক সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। জানালার বাইরে গাছের ছায়া কিংবা ঘরের ভেতরে কোনো প্রাণীর চলাচলও তখন অস্বাভাবিক কিছু বলে মনে হয়।
মনস্তত্ত্বে ভূত বা অতিপ্রাকৃত সত্তার প্রতি তীব্র ও অস্বাভাবিক ভয়কে বলা হয় ‘ফ্যাজমোফোবিয়া’। অন্ধকার ঘর, নির্জন স্থান, পুরোনো বাড়ি কিংবা ভূতের গল্প ও সিনেমা এ ধরনের ভয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে মাঝেমধ্যে ভূতের গল্প শুনে ভয় পাওয়া আর ফোবিয়ায় আক্রান্ত হওয়া এক বিষয় নয়। ভয় যখন নিয়মিত জীবনযাপন, ঘুম কিংবা স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তখন সেটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
ভারতের মনোরোগ চিকিৎসক সৌভিক চক্রবর্তীর মতে, ভয় যে কারণেই তৈরি হোক, তীব্র আতঙ্কের সময় শরীরে প্রায় একই ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম। মস্তিষ্ক সম্ভাব্য বিপদের সংকেত পেয়ে শরীরকে সতর্ক অবস্থায় নিয়ে যায়। একে বলা হয় ‘ফাইট, ফ্লাইট অ্যান্ড ফ্রিজ’ প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ বিপদের মুখে লড়াই করা, পালিয়ে যাওয়া কিংবা ভয়ে সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়া।
আতঙ্কে শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়ভয়ের কারণে শরীরে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরিবর্তন হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
বুক ধড়ফড় করা ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া।
হাত-পা কাঁপা এবং পেশিতে টান অনুভব করা।
শ্বাস নিতে অস্বস্তি হওয়া বা গলা দিয়ে স্বর বের না হওয়া।
শরীরে ঘাম হওয়া ও তাপমাত্রার পরিবর্তন অনুভব করা।
বমি বমি ভাব, পেটে মোচড় ও হজমের সমস্যা।
স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যাওয়া।
যাদের অন্ধকারে ভয় বেশি, তাদের অনেকে আলো নিভিয়ে ঘুমাতে পারেন না। বারবার দরজা-জানালা পরীক্ষা করেন। ঘরের কোণে রাখা কাপড় কিংবা আসবাবের ছায়াকেও সন্দেহজনক মনে হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত, ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
ঘুম ভেঙে ভূত দেখার অনুভূতি কেন হয়?ঘুম থেকে জেগে উঠে ঘরের মধ্যে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা, বুকের ওপর ভারী কিছু চেপে বসার অনুভূতি কিংবা চিৎকার করতে চেয়েও শব্দ করতে না পারার অভিজ্ঞতা অনেকেরই হতে পারে। এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ‘স্লিপ প্যারালিসিস’ বা ঘুমের পক্ষাঘাতের।
ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী সময়ে মস্তিষ্ক সচেতন হয়ে উঠলেও শরীরের পেশি কিছু সময়ের জন্য নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে। এ অবস্থায় ব্যক্তি আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকলেও হাত-পা নাড়াতে বা কথা বলতে পারেন না। কারও কারও মনে হয়, ঘরে কোনো অদৃশ্য উপস্থিতি রয়েছে কিংবা বুকের ওপর কেউ বসে আছে।
অভিজ্ঞতাটি ভীতিকর হলেও এটি ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সাময়িক অসামঞ্জস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘরে অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তার উপস্থিতির প্রমাণ নয়।
যেভাবে কাটাবেন অন্ধকারের ভয়অন্ধকারের ভয় কমাতে প্রথমেই বুঝতে হবে, কল্পনা ও বাস্তবতা এক নয়। রাতে পর্দা নড়ে উঠলে কিংবা কোনো শব্দ শুনলেই সেটিকে অতিপ্রাকৃত ঘটনা ভাবার প্রয়োজন নেই।
এ ধরনের ভয় নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে—
১. ভয়ের গল্প ও সিনেমা এড়িয়ে চলুন: ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত ভীতিকর সিনেমা দেখা কিংবা ভূতের গল্প পড়া থেকে বিরত থাকুন।
২. নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস করুন: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করুন: ভয় পেলে ধীরে ধীরে শ্বাস নিন এবং নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করুন।
৪. জোর করে অন্ধকারে থাকবেন না: একা অন্ধকারে থাকতে ভয় লাগলে প্রয়োজনে হালকা আলো জ্বালিয়ে রাখুন কিংবা পরিবারের কারও সঙ্গে থাকুন।
৫. ধীরে ধীরে ভয় মোকাবিলা করুন: নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখে ধাপে ধাপে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
তবে ভয় যদি এতটাই তীব্র হয় যে একা থাকা, ঘুমানো কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়, তাহলে মনোবিদ বা মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) এবং এক্সপোজার থেরাপি এ ধরনের ভয় মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা (ভারত)
বিভাগ: লাইফস্টাইল

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ