সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পণ্যের প্রচার, ইনবক্সে অর্ডার, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে মূল্য পরিশোধ এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সরবরাহ—এভাবেই পরিচালিত হচ্ছিল একটি সংঘবদ্ধ অনলাইনভিত্তিক শিশা ব্যবসা। দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা নজরদারির পর রাজধানীর চারটি এলাকায় সমন্বিত অভিযান চালিয়ে এই চক্রের কার্যক্রম ভেঙে দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
অভিযানে দেশের ইতিহাসে একক অভিযানে সর্বোচ্চ ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম শিশা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি হুক্কার কয়লা এবং মাদক ব্যবসায় ব্যবহৃত পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চক্রের মূলহোতা দুই সহোদরসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুক্রবার ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন এসব তথ্য জানান।
যেভাবে উন্মোচিত হলো চক্র
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়।
প্রথমে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকা থেকে একটি কুরিয়ার পার্সেলে ১ কেজি শিশা জব্দ করা হয়। পরে মালিবাগে একই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো আরও একটি পার্সেল থেকে আরও ১ কেজি শিশা উদ্ধার করা হয়।
পার্সেলের প্রেরকের তথ্য অনুসরণ করে কালাচাঁদপুরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে দুই সহোদর আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফিকে আটক করা হয়। সেখান থেকে ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম শিশা এবং ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নূরেরচাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. মাকসুদ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ কেজি শিশা এবং ২১টি হুক্কা।
সব মিলিয়ে চারটি স্থানে পরিচালিত অভিযানে মোট ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম শিশা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি কয়লা এবং পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
ইরান থেকে শেখা কৌশলে গড়ে ওঠে ব্যবসা
ডিএনসির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গ্রেপ্তার দুই সহোদর দীর্ঘ সময় ইরানে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে শিশা ব্যবসার কৌশল, বাজারব্যবস্থা ও সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর দেশে ফিরে একই মডেলে অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন।
তারা ফেসবুক পেজে পণ্যের ছবি প্রকাশ করতেন, ইনবক্সে অর্ডার নিতেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে মূল্য গ্রহণ করতেন এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পৌঁছে দিতেন।
ডিজিটাল ফরেনসিকে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
তদন্তে জানা গেছে, লেনদেনের অর্থ বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে গ্রহণ করা হতো। প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় গোপন রাখতে একাধিক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব আর্থিক লেনদেন এখন ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের আওতায় রয়েছে।
জব্দ করা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বিপুল সংখ্যক ক্রেতার তথ্য, অর্ডারের ইতিহাস এবং আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য উদ্ধার হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক এবং চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্তে কাজ চলছে।
ডিএনসি জানায়, ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণে অবৈধ শিশা বিক্রির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আরও কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত মিলেছে। বিষয়গুলো যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএনসির বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, মাদক কারবারিরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স, কুরিয়ার সেবা এবং মোবাইল ব্যাংকিংকে ব্যবহার করে নতুন কৌশলে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসব অপরাধ দমনে সাইবার নজরদারি, ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত, আর্থিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক