মেয়াদ শেষ, টাকা নেই: বায়রা লাইফের দুয়ারে বছরের পর বছর গ্রাহকদের অপেক্ষা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১০:০৯ দুপুর
  • ১১৪৮০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

জীবন বীমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের হাজারো গ্রাহক। পলিসির বিপরীতে জমা দেওয়া মূলধন ও প্রাপ্য অর্থ ফেরত পেতে তারা বারবার কোম্পানির কার্যালয়ে গেলেও মিলছে শুধু আশ্বাস। এতে বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্যমতে, বায়রা লাইফসহ মোট সাতটি জীবন বীমা কোম্পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৬৫ লাখ পলিসির দাবি ঝুলে আছে এবং মোট দাবির পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বাসিন্দা নুরজাহান বেগম ১০ বছর মেয়াদি একটি পলিসি করেছিলেন। ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় এক লাখ টাকা পাননি। বহুবার কোম্পানির কার্যালয়ে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত তার স্বজন বুলবুল খোঁজখবর নিচ্ছেন।

গত বুধবার বায়রা লাইফের কার্যালয়ে এসে বুলবুল বলেন, ২০২২ সালের পর এবার দ্বিতীয়বার এসেছেন। কিন্তু আগের মতোই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোম্পানির হাতে অর্থ নেই। জমি বিক্রির মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের চেষ্টা চলছে বলে তাদের জানানো হয়েছে।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান নোয়াখালীর বাসিন্দা নুরুন্নবী। প্রবাসে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি দুটি জীবন বীমা পলিসি করেছিলেন। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও তিনি কোনো অর্থ ফেরত পাননি।

তার ভাষায়, ‘টাকার জন্য ঘুরতে ঘুরতে দুই জোড়া জুতা ক্ষয় করেছি, কিন্তু আজও টাকা পেলাম না।’

তার সঙ্গে আসা আরেক ভুক্তভোগী আলমগীর জানান, প্রায় সাত বছর ধরে কোম্পানির আশ্বাস শুনে যাচ্ছেন। ১ লাখ ৪ হাজার টাকার চেকলিস্ট হাতে নিয়েও তিনি এখনও অর্থ পাননি।

রাজধানীর ফকিরাপুলে একটি অ্যালুমিনিয়ামের দোকানে কর্মরত বেলালও একই সমস্যার কথা জানান। লক্ষ্মীপুরের এই বাসিন্দা বলেন, তার ১০ বছর মেয়াদি পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে এক বছরেরও বেশি সময় আগে। প্রথমদিকে পলিসিধারী নিজে এলেও এখন হতাশ হয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই তিনি অফিসের ঠিকানা খুঁজে দেখতে এসেছেন।

একইভাবে আঞ্চলিক একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক জিএম নুর ইসলাম, আদম সফিউল্লাহ, জিএম ওমার ফারুক, রাণু, সেলিনা, আয়েশাসহ শত শত গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে তাদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন।

অর্থ সংকটের কথা স্বীকার কোম্পানির

বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বর্তমানে গ্রাহকদের মেয়াদপূর্তির অর্থ এককালীন পরিশোধ করার মতো আর্থিক সক্ষমতা কোম্পানির নেই।

তাদের দাবি, ২০১০ সাল থেকেই বিভিন্ন পলিসির মেয়াদ শেষ হতে শুরু করলেও তখন থেকেই অর্থ পরিশোধে জটিলতা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন টাকা না পেয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের পর ২০১৯ সালে সরকারি সিদ্ধান্তে কোম্পানিটির কার্যক্রম বন্ধ (ডিজলভ) করে দেওয়া হয়।

কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, একসময় গ্রাহকদের পাওনার একটি অংশ সংরক্ষণ করে পর্যায়ক্রমে পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান মালিকপক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

জমি অধিগ্রহণের অর্থেই ভরসা

কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর চৌধুরীপাড়া এলাকায় বায়রা লাইফের প্রায় সাড়ে ৯ কাঠা জমি রয়েছে। মেট্রোরেল প্রকল্পের আওতায় জমিটি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। সাতটি ধাপ শেষ হয়েছে এবং এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।

তাদের আশা, অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ হাতে পেলেই গ্রাহকদের বকেয়া পরিশোধ শুরু করা সম্ভব হবে।

গ্রাহকদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের কথোপকথনের একটি অডিওতেও পুরো অর্থ একসঙ্গে পরিশোধে অক্ষমতার বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে একজন কর্মকর্তা বলেন, আপাতত আংশিক অর্থ পরিশোধের চেষ্টা চলছে।

দুই হাজার ৭০০ কর্মী থেকে নেমে ১০-১২ জন

বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের জেনারেল ম্যানেজার মোবারক হোসেন বলেন, একসময় কোম্পানিতে প্রায় দুই হাজার ৭০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৭০ থেকে ৮০টি গাড়ি ছিল। বর্তমানে কর্মী সংখ্যা কমে মাত্র ১০-১২ জনে দাঁড়িয়েছে।

তিনি জানান, এখন নতুন কোনো পলিসি বিক্রি বা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা থাকা পরিশোধিত মূলধনের সুদ থেকে মাসে ১৫ থেকে ২২ লাখ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে কোনোভাবে অফিস পরিচালনা করা হচ্ছে।

তার ভাষায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ জন গ্রাহক টাকা নিতে অফিসে আসেন। কিন্তু অর্থ দিতে না পারা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের বিষয়।

আইডিআরএর লাল তালিকায় সাত প্রতিষ্ঠান

আইডিআরএর সদস্য (লাইফ) আপেল মাহমুদ জানান, ব্যর্থতার কারণে বায়রা লাইফসহ সাতটি প্রতিষ্ঠানকে লাল তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, প্রোগ্রেসিভ লাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ।

তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬৫ লাখ পলিসি ঝুলে আছে এবং মোট দাবি প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

আইডিআরএর ভাষায়, সমস্যাগ্রস্ত এসব প্রতিষ্ঠান বীমা শিল্পের জন্য ‘ক্যানসারের’ মতো। তাই প্রয়োজন হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সম্পদ কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা ফেরতের নির্দেশ

আইডিআরএ জানিয়েছে, নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়া যাচাইয়ে একটি অডিট ফার্মও নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আপেল মাহমুদ বলেন, মালিবাগ এলাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পে অধিগৃহীত বায়রা লাইফের জমি থেকে প্রায় ৫৪ কোটি টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অর্থ শুধু গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের জন্য একটি বিশেষ হিসাবে সংরক্ষণ করা হবে। তবে গ্রাহকদের মোট পাওনা ৫৮ থেকে ৬০ কোটি টাকা হওয়ায় এরপরও প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ঘাটতি থাকবে।

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি নিষ্পত্তিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইডিআরএ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad