হাসপাতালে দালাল, টেস্ট বাণিজ্য ও অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধে কঠোর অভিযান, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৩ বিকাল
  • ৩৭৫৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া দালাল চক্র, কমিশনভিত্তিক টেস্ট বাণিজ্য, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন এবং স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, সরকারি হাসপাতালে দালালচক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

বুধবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেন্ট রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।

অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক।

গবেষণাটি দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হয়। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত চর্চা মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান, নীতিনির্ধারক, সরবরাহকারী, শিক্ষাবিদ ও রোগীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে এ হার ছিল সর্বনিম্ন, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত অর্থ থাকলেও মাত্র ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

স্বাস্থ্য খাতে টেন্ডার অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করা হয়। পাঁচ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের অভিজ্ঞতার মতো শর্ত প্রতিযোগিতা সীমিত করে পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই রাখা হয়।

অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকা দিয়ে দুটি কেনা হয়েছিল। কিন্তু যেখানে সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোই প্রস্তুত ছিল না। একইভাবে প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল ছাড়াই বিভিন্ন স্থানে এক্স-রে ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কিনে ফেলে রাখা হয়েছে, যা এখন প্রায় অকেজো।

সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেও পাশের বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠিয়ে কমিশনভিত্তিক টেস্ট ও চিকিৎসা বাণিজ্যের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, সরকারি দায়িত্বে থেকে বাইরে ক্লিনিক পরিচালনা, সেখানে অস্ত্রোপচার করা এবং রোগীদের নির্দিষ্ট ক্লিনিকে টেস্ট করাতে বাধ্য করার প্রবণতা বন্ধে কঠোর মনিটরিং করা হবে।

হামের টিকাদান কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, গত সরকারের সময় দীর্ঘদিন টিকা সংগ্রহ ও ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের ৯৯ শতাংশই টিকাবঞ্চিত। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার নতুন করে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করেছে এবং সম্প্রতি এক লাখের বেশি শিশুকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।

ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ আমল থেকে একটি বিদেশি কোম্পানি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডায়ালাইসিস সেবার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছিল। আগামী নভেম্বরে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস মেশিন সংগ্রহ করবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি কম খরচে সাধারণ মানুষ সেবা পাবেন। এছাড়া প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যা এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, স্তন ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে দেশের ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমৃদ্ধ কিট সরবরাহ করা হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে উচ্চতা, ওজন, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, লিপিড প্রোফাইল, আরবিসি ও সিবিসি পরীক্ষাসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেবেন।

মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, অডিটের নামে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে এক টাকাও ঘুষ দেওয়া যাবে না। কেউ অনৈতিকভাবে অর্থ দাবি করলে তা সরাসরি মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে।

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধে কঠোর নজরদারির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সিজার করানোর অপচেষ্টা রোধে সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সারাদেশে বেসরকারি ক্লিনিকে আকস্মিক পরিদর্শন জোরদার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় লেবার রুম, লেবার চেয়ার ও নবজাতকের চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া পরিচালিত অনেক ক্লিনিক ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad