আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মনিরুল হক দাবি করেছেন, র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে ২০১০ সালে বরগুনার পাথরঘাটা এলাকায় বলেশ্বরী নদীতে হাত ও চোখ বাঁধা এক বন্দিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তার শরীরে ভারী বস্তা বেঁধে পেট কেটে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর আরও কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ এবং নদীতে লাশ ফেলার মতো শব্দ তিনি শুনতে পান বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ব্রিগেডিয়ার (অব.) মনিরুল হক।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০১০ সালে বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানি ঘাট থেকে একটি বোটে করে বলেশ্বরী নদীর মোহনার দিকে বিশেষ অভিযানে যাওয়া হয়। বন্দিদের বোটের ভেতরে রাখা হলেও তিনি, মেজর সাব্বির এবং কর্নেল জিয়াউল আহসানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা বোটের ছাদে অবস্থান করেন। কিছুক্ষণ পর নিচে কী হচ্ছে দেখতে গিয়ে তিনি দেখেন, জিয়াউলের নেতৃত্বে চোখ ও হাত বাঁধা এক ব্যক্তির শরীরে ভারী বস্তা বাঁধা হচ্ছে। এরপর তাকে গুলি করে ছুরি দিয়ে পেট কেটে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে আরও কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ এবং পানিতে লাশ ফেলার শব্দ শোনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
মনিরুল হক আরও বলেন, অভিযানের দুই থেকে চার দিন পর শরণখোলা এলাকায় পেট কাটা একটি লাশ নদীতে ভেসে ওঠে। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ওই লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
জবানবন্দিতে তিনি আরও দাবি করেন, বরিশাল অঞ্চলে বিভিন্ন অভিযানে ব্যবহৃত একটি বোটের মাঝি আলকাসের মাধ্যমে গোপন তথ্য ফাঁস হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে তাকে ‘এলিমিনেট’ (হত্যা) করার নির্দেশ দেন জিয়াউল আহসান। তবে মেজর সাব্বির সেই নির্দেশ পালন করতে অস্বীকৃতি জানান। কিছুদিন পর আলকাস নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় তিনি ধারণা করেন, ইন্টেলিজেন্স উইং-ই তাকে গুম করেছে।
ব্রিগেডিয়ার (অব.) মনিরুল হক আদালতকে জানান, তিনি ২০০৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত র্যাব-৮-এর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় নিয়মিত র্যাব সদর দপ্তরের কমান্ডারদের সম্মেলনে অংশ নিতেন। সেখানে দুর্ধর্ষ অপরাধীদের বিষয়ে আলোচনা চলাকালে তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দ ব্যবহার করে অপরাধীদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা উইং বিভিন্ন ব্যাটালিয়নকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করত। তাদের সহযোগিতায় ভোলা ও সুন্দরবন এলাকায় একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি লাশের ঘটনায় তার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, টার্গেট এলাকায় নেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছিল এবং পরে ঘটনাগুলো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
জবানবন্দিতে সুন্দরবনের কুখ্যাত রাজু ডাকাতকে ধরতে পরিচালিত একটি অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন মনিরুল হক। তিনি বলেন, ওই অভিযানে র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। যদিও অভিযানের লক্ষ্য ছিল রাজু ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা, তবে তাকে পাওয়া যায়নি; পরিবর্তে কয়েকটি লাশ উদ্ধার করা হয়। সুন্দরবনের নিশানখালী এলাকায় পরিচালিত আরেকটি অভিযানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সন্দেহের কথা তিনি আদালতকে জানান।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুম, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মামলাটির শুনানিতে সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক