সৌদি জোটে বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত

  • এইচএম মোকাদ্দেস,নির্বাহী সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৯ দুপুর
  • ২৮৪৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর, কাতারসহ মোট ১৩টি দেশের সঙ্গে এই জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে বিশ্লেষকরা একদিকে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখলেও, অন্যদিকে এর সঙ্গে জড়িত কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমবাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ রক্ষার স্বার্থে এই জোটে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখাও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগর ব্যবহার করছে। তবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ অবরোধের ঘোষণায় সেই পথও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে অবস্থিত প্রায় ৩০ কিলোমিটার প্রশস্ত এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এই রুটে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতেও চাপ বাড়তে পারে।

যে উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে জোট

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জোটটির মূল লক্ষ্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে সদস্য দেশগুলো গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, সমন্বিত টহল এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ছাড়াও জোটে রয়েছে তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস।

কেন যুক্ত হলো বাংলাদেশ

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার। দেশটিতে ২৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধেও সৌদি আরবের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অংশ নিয়েছিল। পরবর্তীতে কুয়েত পুনর্গঠন কার্যক্রমেও বাংলাদেশের সেনারা ভূমিকা রাখে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ড. নাসির উদ্দিন আহমেদের মতে, এই জোটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আধুনিক সামুদ্রিক যুদ্ধ কৌশল, সাবমেরিনবিরোধী অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ মহড়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশরের মতো দেশের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে নৌ সক্ষমতা আরও বাড়বে।

তিনি আরও মনে করেন, লোহিত সাগর নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যও নিরাপদ থাকবে। একই সঙ্গে আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলে নতুন রপ্তানি বাজার এবং জনশক্তি রপ্তানির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

ঝুঁকিও কম নয়

যদিও সৌদি আরব বলছে, এই জোট সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে গঠন করা হয়নি, তবুও বিশ্লেষকরা এর সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কারণ সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইরানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জে ইউ ভুঁইয়ার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপ ইরান পর্যবেক্ষণ করবে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হলে এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে।

এছাড়া এই জোট জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাভুক্ত নয়। ফলে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, অতীতে সৌদিতে বাংলাদেশের ঘাঁটিগুলোকে ব্রিটিশ বাহিনী আকাশ প্রতিরক্ষা দিয়েছিল। এবার সেই ধরনের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাই বড় চ্যালেঞ্জ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের শুরু থেকেই বাংলাদেশ সংযম, সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাই সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে অংশগ্রহণের পরও সেই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে এই জোটে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে এই জোটে বাংলাদেশের ভূমিকা, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার, সদস্যদের বীমা, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কেও পরিষ্কার নীতিমালা থাকা জরুরি।

বিশ্লেষকদের অভিমত, হরমুজ প্রণালির পর যদি বাব আল-মান্দেবও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়বে। সে বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশেরও দায়িত্ব রয়েছে। তবে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য, জাতীয় স্বার্থ এবং নিরাপত্তা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad