২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তী তিন দিন—৬, ৭ ও ৮ আগস্ট—দেশে কার্যত কোনো সরকারপ্রধান ছিল না। এ সময় প্রশাসনিক শূন্যতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নানা প্রক্রিয়া একযোগে চলতে থাকে।
অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দায়িত্ব থেকে সরে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করার সিদ্ধান্ত
৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ছাত্র আন্দোলনের নেতারা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিলে পরদিন ৬ আগস্ট বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, তিন বাহিনীর প্রধান এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বৈঠকে তাকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক শেষে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে এবং তিনি এতে সম্মতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের সম্ভাব্য সদস্যদের একটি তালিকাও রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া হয়।
পরদিন ৭ আগস্ট প্যারিস থেকে দেশে ফিরে ড. ইউনূস দেশবাসীর উদ্দেশে শান্তি, সংযম ও নৈরাজ্য পরিহারের আহ্বান জানান।
৮ আগস্ট শপথ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার
তিন দিন সরকারপ্রধানবিহীন পরিস্থিতির অবসান ঘটে ৮ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টায়। বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ১৩ জন উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করান। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
সংসদ বিলুপ্ত ও খালেদা জিয়ার মুক্তি
৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। একই দিন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে সম্পূর্ণ মুক্তি দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিভিন্ন মামলায় আটক ব্যক্তিদের পর্যায়ক্রমে মুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতাও ওই দিন কারামুক্ত হন।
প্রশাসনে আতঙ্ক ও অচলাবস্থা
অভ্যুত্থানের পরদিন সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় অফিসে এলেও দুপুরের মধ্যেই অনেকেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের নামফলক এবং ছবি সরিয়ে ফেলা হয়।
পরবর্তী সময়ে প্রশাসন, আইন বিভাগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন উচ্চপদে রদবদল শুরু হয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অনেকেই পদত্যাগ করেন বা অব্যাহতি পান।
পুলিশশূন্য থানা ও আইনশৃঙ্খলার সংকট
অভ্যুত্থানের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর ফলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অধিকাংশ থানা কার্যত পুলিশশূন্য হয়ে পড়ে। পুলিশ সদর দপ্তর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটেও কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
পরবর্তীতে জানা যায়, সহিংসতায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। নিহতদের সহকর্মীরা অভিযোগ করেন, হামলার সময় অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দায়িত্বস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।
নতুন আইজিপি ও সেনাবাহিনীতে রদবদল
৬ আগস্ট অতিরিক্ত আইজিপি ময়নুল ইসলামকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়েও ব্যাপক রদবদল করা হয় এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দায়িত্ব পরিবর্তন করা হয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
গণঅভ্যুত্থানের পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের আহ্বান জানান। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোও শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
আয়নাঘর থেকে মুক্তি
৬ আগস্ট দীর্ঘ আট বছর পর মুক্তি পান সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী এবং আইনজীবী আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। পরে তারা নিজ নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যান।
শিক্ষার্থীদের হাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ
পুলিশের অনুপস্থিতিতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষার্থীরা। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তারা স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে সন্দেহজনক যানবাহনেও তল্লাশি চালানো হয়।
কারাগারে অস্থিরতা
সরকারহীন সময়ে দেশের কয়েকটি কারাগারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে ২০৯ বন্দি বেরিয়ে যান। কুষ্টিয়া জেলা কারাগার থেকেও বহু বন্দি পালিয়ে যান। পরে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সাতক্ষীরা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েক শত বন্দির একটি বড় অংশ পুনরায় ফিরে আসে।
অভ্যুত্থানের পরবর্তী এই তিন দিন ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম অস্থির সময়। রাজনৈতিক শূন্যতা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং দ্রুত অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশ নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার