১৫ আগস্টের স্মৃতি: এক ভোর, এক অভ্যুত্থান ও ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৫ দুপুর
  • ১০২৮৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

১৫ আগস্টের স্মৃতি: এক ভোর, এক অভ্যুত্থান ও ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা

ড. আহমদ আনিসুর রহমান

১৪ আগস্টের রাত পেরিয়ে ১৫ আগস্টের ভোর। মিরপুর রোডের পাশে আসাদ গেট নিউ কলোনির মসজিদের সামনে ছিলাম। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো গোলাগুলির শব্দ। যারা একটু পরে মর্নিং ওয়াকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সবাই চমকে উঠলেন। শব্দটি আসছিল ৩২ নম্বরের দিক থেকে—আমাদের নিউ কলোনি থেকে মাত্র একটি বাসস্টপ দূরে, মাঝখানে শুধু লালমাটিয়া।

কেউ বললেন, হয়তো শেখ জামালের বিয়ের আনন্দে আতশবাজি ফোটানো হচ্ছে। কারণ, সদ্যই শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু আমার মনে অজানা এক আশঙ্কা তৈরি হলো। বললাম, “না—৩২ নম্বরে কিছু হয়ে গেছে!”

শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের কাছে অপরিচিত কেউ ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রতিবেশী। আমার বাবা ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন সংগ্রামে তার সহযোদ্ধা ছিলেন। তাই ছোটবেলা থেকেই আমরা তাকে ‘শেখ সাহেব’ বলেই অভ্যস্ত ছিলাম। আনুষ্ঠানিক উপাধির চেয়ে এই সম্বোধনই আমাদের কাছে বেশি স্বাভাবিক ছিল।

ছোটবেলায় শেখ জামালকে আমাদের নিউ কলোনি ক্রিকেট ক্লাবে খেলতে আসতে দেখেছি। তখন আমাদের ক্লাবের বেশ নামডাক ছিল। ‘নিউ কলোনি ক্রিকেট ক্লাব’-এর সংক্ষিপ্ত নাম দিয়েছিলাম ‘এনসিসি’, ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘এমসিসি’র আদলে। আমিও ঘটনাচক্রে স্পিন বোলার হয়ে উঠেছিলাম। আমাদের ক্লাবের ভালো ক্রিকেটারদের মধ্যে বাবু ও তার বড় ভাই খোকা উল্লেখযোগ্য ছিলেন। শেখ জামালও লালমাটিয়া পেরিয়ে আমাদের মাঠে খেলতে আসতেন।

পরে শেখ মুজিব দেশের বড় নেতা হয়ে উঠলেন এবং রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি হলেন। তখন জামালের সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিল না। তিনি সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশেও গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে তার বিয়ে হয়। একই সময়ে আমার ব্যাচমেট শেখ কামালেরও বিয়ে হয়। ফলে ১৫ আগস্টের ভোরে গোলাগুলির শব্দকে কেউ কেউ বিয়ের আনন্দের আতশবাজি বলে মনে করেছিলেন।

শেখ কামাল ছিলেন আমার ঢাকা কলেজের সহপাঠী। ১৯৬৭ সালে স্কুল পাস করার পর ঢাকা কলেজে ভর্তি হলে জামালের পরিবর্তে কামালই হয়ে ওঠেন আমাদের সতীর্থ। খুব ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও সহপাঠী হিসেবে তাকে কাছ থেকে দেখেছি। কলেজজীবনে তিনি বেশ দুষ্টু প্রকৃতির ছিলেন। একবার কোনো একটি ঘটনায় প্রিন্সিপাল জালাল স্যারের সঙ্গে তার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, করিডোর ধরে তাকে ধরতে প্রিন্সিপালকে পর্যন্ত ছুটতে হয়েছিল—ঘটনাটি তখন আমাদের কাছে বেশ মজার দৃশ্য হয়ে উঠেছিল।

শেখ মুজিব যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হয়ে বন্দি ছিলেন, তখন অনেকে তার পরিবার থেকেও দূরে থাকার চেষ্টা করতেন। বিষয়টি আমার ভালো লাগত না। সেই দুর্দিনে শেখ হাসিনার বিয়েও হয়েছিল অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। শেখ মুজিব কারাগার থেকে মাত্র একটি আংটি পাঠাতে পেরেছিলেন বলে মনে পড়ে।

কিন্তু ১৯৭৫ সালে কামাল-জামালের বিয়ে হয়েছিল জাঁকজমকের সঙ্গে। বিয়েতে তাদের সোনার মুকুট পরানো হয়েছিল। দেশে তখন দুর্ভিক্ষের কঠিন সময়। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে রাজকীয় বিয়ের আয়োজন ও অন্যদিকে দুর্ভিক্ষে মানুষের মৃত্যুর ছবি—দুটো একসঙ্গে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ায় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল।

শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা ছিলেন আমার সহপাঠিনী। সোভিয়েত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রুশ ভাষা শেখার সময় তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তিনি ছিলেন সুন্দরী, সুশীল ও ক্রীড়াবিদ। ফলে ৩২ নম্বরের বাড়িতে তখন বিয়ের আনন্দ-উৎসব চলছিল। সেই কারণে গোলাগুলির শব্দকে প্রথমে আতশবাজি মনে করার একটি স্বাভাবিক কারণও ছিল।

কিন্তু আমার আশঙ্কাই সত্যি হলো।

আমি পায়ে হেঁটে ৩২ নম্বরের দিকে ছুটে গেলাম। ছাত্রজীবনে রিকশায় ওঠার অভ্যাস ছিল না। আমাদের বাসা থেকে ৩২ নম্বর খুব বেশি দূরও নয়। কিন্তু সোবহানবাগ মসজিদের সামনে গিয়ে বাধার মুখে পড়লাম। আর এগোতে পারলাম না।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে প্রায় প্রতিদিনই গভীর রাত পর্যন্ত ৩২ নম্বরে থেকেছি। দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিজের চোখে দেখার ও মনে রাখার তাগিদ ছিল। ২৫ মার্চ রাতেও শেখ মুজিবের গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। এরপর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে ক্ষমতার শীর্ষে আসীন হওয়ার পর আর সেখানে যাইনি। ক্ষমতা ও ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে দূরে থাকাই আমাদের পারিবারিক শিক্ষা ছিল। কারণ, চাটুকারিতা ও লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে অসৎ উপার্জনের পথ থেকে দূরে থাকাকে আমরা জ্ঞানচর্চাকারীর দায়িত্ব বলে মনে করতাম।

১৫ আগস্ট সকালে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম। কিছুদিন আগে রেডিওতে খণ্ডকালীন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। শাহবাগে ছিল অফিস। পথে শুনলাম, সৈন্যরা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে। এমনকি শেখ মণির মতো কঠোর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও নিহত হয়েছেন বলে শুনলাম।

আরও বিস্মিত হলাম যখন দেখলাম, কোথাও কোথাও মানুষ মিষ্টি বিতরণ করছে। বিভিন্ন জায়গায় লোকজন জটলা করছে। আমার মনে প্রশ্ন জাগল—কেউ মারা গেলে মানুষ এভাবে আনন্দ প্রকাশ করে?

তখন হাইস্কুলের একটি ইংরেজি কবিতার কথা মনে পড়ল—‘Patriot’। কবিতাটিতে একজন দেশপ্রেমিকের দুই বিপরীত পরিণতির চিত্র ছিল। একসময় তিনি বীরের মর্যাদায় জনতার উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা পান; পরে সেই একই জনতার সামনে মৃত্যুদণ্ডের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।

ইতিহাসের এই নির্মম শিক্ষা যেন ১৫ আগস্টের সকালে চোখের সামনে বাস্তব হয়ে উঠেছিল।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবের দেশে ফেরার দিন যে বিপুল জনসমুদ্র তাকে স্বাগত জানিয়েছিল, সেই দৃশ্যও মনে পড়ল। অথচ মাত্র সাড়ে তিন বছর পর তার মৃত্যুর দিনে তার বাড়ির কাছেও যেতে পারলাম না। বরং কোথাও কোথাও মানুষের মধ্যে দেখা গেল স্বস্তি কিংবা আনন্দের প্রকাশ।

একসময়কার খেলার সঙ্গী শেখ জামাল, সহপাঠী শেখ কামাল, সহপাঠিনী সুলতানা—কেউ আর নেই। প্রতিবেশী শেখ সাহেবও নেই।

শাহবাগে রেডিও অফিসে গিয়ে দেখলাম, অফিসের বাইরে কিছু সৈন্য অবস্থান করছে। তাদের সঙ্গে ছিল অস্ত্র। শুনলাম, তারাই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। তারা নাকি বলছিল, ক্ষমতা নেওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয়; দেশের প্রয়োজনীয় কাজ তারা করে দিয়েছে, এখন দেশবাসী ক্ষমতা গ্রহণ করুক।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—দেশবাসী কি কখনো সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে?

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, জনগণের নামে প্রায় সব সময়ই কোনো না কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠী ক্ষমতা গ্রহণ করে। কখনো তা প্রকাশ্যভাবে, কখনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আড়ালে। এটি শুধু একটি দেশের নয়, প্রায় সব দেশ ও সব সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই এক কঠিন বাস্তবতা।

জনগণের প্রকৃত কল্যাণের জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে, আর সৎ ও সাহসী তরুণরা জনগণের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় থাকবে। জনগণের চাওয়া-পাওয়া ও অধিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে লালিত জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে জাগ্রত ও শক্তিশালী করার দীর্ঘ সংগ্রাম প্রয়োজন।

১৫ আগস্টের স্মৃতি তাই শুধু একটি ব্যক্তির বা একটি পরিবারের করুণ পরিণতির স্মৃতি নয়। এটি একই সঙ্গে ক্ষমতা, জনসমর্থন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের নির্মম পরিহাসের এক গভীর শিক্ষা। ১৯৭২ সালের জনতার উচ্ছ্বাস থেকে ১৯৭৫ সালের নীরবতা—মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে ইতিহাস যে কত দ্রুত তার মুখ বদলাতে পারে, ১৫ আগস্ট তারই এক কঠিন স্মারক।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad