রাজনীতিতে মিথ্যাচার: সত্যের সংকট, গণতন্ত্রের ক্ষতি 'মো. জাকির হোসাইন

  • মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩০ দুপুর
  • ২৪০১৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

রাজনীতিতে মিথ্যাচার: সত্যের সংকট, গণতন্ত্রের ক্ষতি

রাজনীতিতে মতের ভিন্নতা থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যখন মিথ্যাচার, অপপ্রচার, অর্ধসত্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য বিকৃতির আশ্রয় নেয়, তখন সংকটটি আর কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার, রাজনৈতিক আস্থা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকেও প্রভাবিত করে।

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সময়ে এ সংকটের মাত্রা আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য, ছবি কিংবা তথ্য যাচাই ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরবর্তী সময়ে সেটি ভুল বা বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হলেও প্রথম প্রচারের প্রভাব অনেক সময় পুরোপুরি দূর হয় না। ফলে জনপরিসরে সত্য, অর্ধসত্য ও মিথ্যার পার্থক্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ নাগরিকের ওপর। কারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নাগরিকের প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য। তথ্য যদি বিকৃত হয়, তবে সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্তও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের সত্যতা ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এখন কেবল নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নীতিনির্ধারকদের করণীয়

এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বও সুস্পষ্ট। নির্বাচনী প্রচারণায় বিভ্রান্তিকর তথ্যের অভিযোগ যাচাই ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের বক্তব্য ও প্রচারণায় তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এবং ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে তা সংশোধনের দৃষ্টান্ত তৈরি করা। সরকারের দায়িত্ব সরকারি পরিসংখ্যান, প্রকল্প, ব্যয় ও নীতিসংক্রান্ত তথ্য নাগরিকের জন্য সহজে যাচাইযোগ্য ও উন্মুক্ত রাখা। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণ ও আইনি মানদণ্ডকে ভিত্তি করতে হবে।

তবে মিথ্যা তথ্য মোকাবিলার উদ্যোগ কোনোভাবেই বৈধ সমালোচনা, ভিন্নমত বা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত করার উপায় হওয়া উচিত নয়। তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্রে ভুল তথ্যের প্রতিকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন প্রশ্ন করার স্বাধীনতাও।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব কম নয়। প্রতিশ্রুতি ও বক্তব্যে বাস্তবতা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং ভুল হলে তা সংশোধনের মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। প্রতিপক্ষের নীতি ও কর্মসূচির সমালোচনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু সমালোচনার ভিত্তি যদি হয় অযাচাইকৃত বা বিকৃত তথ্য, তাহলে রাজনৈতিক বিতর্কের মানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; এটি তথ্য জানার, প্রশ্ন করার এবং যুক্তির ভিত্তিতে মত গঠনেরও একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় সত্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ অপরিহার্য। রাজনৈতিক মতের লড়াই থাকুক, নীতির বিতর্ক থাকুক, তীব্র সমালোচনাও থাকুক—কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার ভিত্তি হোক যাচাইযোগ্য তথ্য ও যুক্তি।

কারণ গণতন্ত্রের শক্তি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে নয়; সত্য তথ্যের ভিত্তিতে নাগরিকের স্বাধীন ও সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যেও নিহিত।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad