মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত ‘সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট—সরকার ও জনগণের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অভিযোগ করেন।
রিজভী বলেন, বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে তৈরি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরকেন্দ্রিক সংঘাত, এলএনজি আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা এবং মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তবে সংকট মোকাবিলায় সরকার বসে নেই।
তিনি বলেন, সংকট সমাধানে সরকারের নিজস্ব উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। লকডাউন বা বিভিন্ন কর্মসূচির নামে রাজপথ দখলে রাখার হুমকি কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।
বিএনপির এই নেতা বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের সরকারের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। সরকারের ভুল-ত্রুটি নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা হলে সরকারও তা সংশোধনের সুযোগ পায়। তবে বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে। হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগর দিয়ে বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল করে। বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির একটি বড় অংশও এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও মাইন পাতা হচ্ছে, কোথাও কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় এলএনজি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, বাসাবাড়িতে গ্যাস দেওয়া, শিল্পকারখানা সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রিজভী জানান, সংকট মোকাবিলায় সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুত গ্যাস সংগ্রহে প্রতিবেশী ও নিকটবর্তী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, টার্মিনালটি মেরামতের কাজ চলছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলএনজি সরবরাহে সমস্যা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি—দুই কারণেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
তবে বর্তমান সংকটের পেছনে বিগত সরকারের দীর্ঘদিনের অনিয়মের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন রিজভী। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এমন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে। জনগণের কোষাগার থেকে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের বিপুল অর্থ দেওয়া হয়েছে।
এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানার সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, জনগণের অর্থ ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ব্যাংক খাতের অনিয়মের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, ব্যাংক খাত থেকেও জনগণের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের কর্মকাণ্ডের দায়মুক্তি দিতে ইনডেমনিটি আইন করা হয়েছিল, যাতে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করা না যায়। তার ভাষায়, এটি ছিল দুর্নীতির মানসিকতা থেকে তৈরি একটি ব্যবস্থা।
রিজভী বলেন, সরকারের কোনো কর্মকাণ্ড সন্দেহজনক মনে হলে জনগণের অভিযোগ করার এবং আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার থাকতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে না পারে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকায় দেশে বারবার গণতন্ত্র আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। উচ্চতর আদালত, গণমাধ্যম, পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
পুলিশ প্রশাসনের বিষয়ে রিজভী বলেন, পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
গণমাধ্যম প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদী শাসনে গণমাধ্যমের মালিকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য, আত্মীয়তা ও ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। এর মাধ্যমে দুঃশাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। শিশু, শিক্ষার্থী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে।
চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান রিজভী। তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন। সরকারকে যেমন দায়িত্ব পালন করতে হবে, তেমনি নাগরিক হিসেবেও প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে।
রিজভী বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়, সংকট সমাধানের পথও দেখানো। একই সঙ্গে সরকারকেও তার উদ্যোগ আরও কার্যকর করতে হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য চিত্রনায়ক হেলাল খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এমপি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান, জাসাসের সদস্যসচিব জাকির হোসেন রোকন, বিএনপির সহসাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইদ সোহরাব, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সফু এবং গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শামিমুর রহমান শামিমসহ অন্যরা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক