কৃষকের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় না নিয়ে সারের বরাদ্দ

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
মাঠপর্যায়ে কৃষকের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় না নিয়েই পুরোনো কাঠামোয় সারের বরাদ্দ ও বিতরণ কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। কৃষকের অভিযোগ, ফসলের আবাদ ও বৈচিত্র্য বাড়লেও অধিকাংশ এলাকায় সারের বরাদ্দ আগের মতোই রয়েছে। কোথাও কোথাও বরাদ্দ কমানো হয়েছে। ফলে চাহিদার সময় প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে সংকটে পড়ছেন কৃষক। কোনো কোনো এলাকায় ক্ষুব্ধ কৃষক সার লুটের ঘটনাতেও জড়িয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল উৎপাদন, শাকসবজির আবাদ বৃদ্ধি এবং মাছ চাষ সম্প্রসারণের কারণে সারের প্রকৃত চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু এ পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে কার্যকর জরিপ বা গবেষণা না হওয়ায় বরাদ্দ নির্ধারণে বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না। ফসলের আবাদ ও চাহিদার ভিত্তিতে জেলাভিত্তিক নতুন জরিপ করে বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণ না করলে সংকট কাটানো কঠিন হবে।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) দাবি, দেশে আবাদি জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। তাদের যুক্তি, দেশের মানচিত্রে নতুন কোনো ভূখণ্ড বা দ্বীপাঞ্চল যুক্ত হয়নি। ফলে জমি ও আবাদের পরিমাণও আগের তুলনায় খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি।

অধিকাংশ জেলায় বরাদ্দ অপরিবর্তিত

২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলাভিত্তিক বিভিন্ন রাসায়নিক সারের বরাদ্দ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সংকটের মধ্যেও অধিকাংশ জেলার বরাদ্দ আগের বছরের মতোই রাখা হয়েছে। কিছু জেলায় সামান্য বাড়ানো হলেও কোথাও কোথাও বরাদ্দ কমেছে।

রাজশাহী জেলায় গত বছর ইউরিয়ার বরাদ্দ ছিল ৭১ হাজার টন। চলতি বছরও তা একই রাখা হয়েছে। টিএসপি ও এমওপির বরাদ্দও অপরিবর্তিত রয়েছে। সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জেও একই চিত্র।

অন্যদিকে গাজীপুর জেলায় ইউরিয়ার বরাদ্দ কমানো হয়েছে। গত বছর যেখানে ২১ হাজার টন বরাদ্দ ছিল, চলতি অর্থবছরে তা কমিয়ে ১৮ হাজার ২০৩ টন করা হয়েছে।

কৃষি ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে দেশে গড়ে ১১০ থেকে ১১৫ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। এর মধ্যে আমন প্রায় ৫৭ থেকে ৫৮ লাখ হেক্টর, বোরো প্রায় ৫০ লাখ এবং আউশ ১০ থেকে ১৩ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়। এর বাইরে শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব ফসলের বাড়তি সারের চাহিদা বরাদ্দ নির্ধারণের সময় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, মাঠপর্যায়ে সারের চাহিদা বেড়েছে—এ বিষয়টি নীতিনির্ধারকরা মানতে চান না। দেশে শুধু ধান নয়, অন্যান্য ফসল ও শাকসবজির আবাদও বেড়েছে। কিন্তু পুরোনো কাঠামোর বরাদ্দ দিয়েই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফসলের আবাদ ও প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী জরিপ করে বরাদ্দ না বাড়ালে সংকট কাটবে না।

বাড়ছে বহুমুখী ব্যবহার

বিভিন্ন জেলার বিএফএ নেতারাও সারের বাড়তি চাহিদার কথা জানিয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএফএ সভাপতি জানান, জেলায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। ‘কাটিমন’ জাতের আম চাষে বছরে তিনবার সার প্রয়োগ করতে হয়। ফলে সেখানে বাড়তি সারের প্রয়োজন হলেও বরাদ্দ আগের মতোই রয়েছে।

জয়পুরহাট জেলা বিএফএ সভাপতি জানান, আলু উৎপাদনের পাশাপাশি হ্যাচারি, পোলট্রি ও ফিশারিতে সারের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে জেলায় অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন।

সার মজুত থাকলেও ক্ষোভ কমছে না

সার বিক্রি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিলার পয়েন্টে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করা হচ্ছে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট, শাহবন্দেগী, গাড়ীদহ ও বিশালপুর ইউনিয়নের গুদামগুলোতে পর্যাপ্ত সার থাকার কথা জানিয়েছে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন।

গত ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে ইউরিয়া ২ হাজার ৮৩০ টন, টিএসপি ৯৫৮ টন, এমওপি ১ হাজার ৯৮১ টন এবং ডিএপি ১ হাজার ৮১০ টন মজুত ছিল।

এদিকে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি ও মূল্যতালিকা না টাঙানোর অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৩ ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাকে ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এরপরও সার নিয়ে কৃষকের ক্ষোভ কমছে না।

গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় বাজারে মধ্যরাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা ডিলারের গুদামের টিনের বেড়া ভেঙে ১০০ থেকে ১৫০ বস্তা ইউরিয়া নিয়ে যান। এর আগে ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নে ডিলারের গুদাম ভেঙে ২০২ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

সারের দাবিতে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, লালমনিরহাট ও রাজশাহীতে মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে। তবে প্রশাসনের দাবি, সরাসরি লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি; অতিরিক্ত ভিড় ও গুজবের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় কিছু সার খোয়া গেছে।

এমওপির মজুত কমেছে

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া ৪ লাখ ১ টন, টিএসপি ৩ লাখ ৩৯৬ টন, ডিএপি ৩ লাখ ৯৭ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৮৫৭ টন মজুত রয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ে এমওপির মজুত ছিল ২ লাখ ৮২৬ টন। অর্থাৎ এক বছরে এমওপির মজুত প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া ১৪ দশমিক ৯৬ লাখ টন, টিএসপি ৪ দশমিক ৬৮ লাখ টন, ডিএপি ১০ দশমিক ২৩ লাখ টন এবং এমওপি ৬ লাখ টনসহ মোট ৩৫ দশমিক ৮৭ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরকার এ সময়ে ৩৬ দশমিক ৭৬ লাখ টন সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান বলেন, দেশে সারের সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি চলছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে শাস্তি ও জরিমানা করা হচ্ছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad