ভুল কৃষি পরামর্শে বাড়ছে ফসল ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০২ দুপুর
  • ২৭৮৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি : এআই দিয়ে তৈরি
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন রোগ-পোকার বিস্তার, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বালাইনাশকের প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির মতো নানা চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে। ফলে কৃষকের জন্য সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য কৃষি পরামর্শের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক কৃষক ফসলের সমস্যা দেখা দিলে কৃষি কর্মকর্তার পরিবর্তে স্থানীয় কৃষি উপকরণ ও কীটনাশক বিক্রেতার কাছে ছুটছেন। এতে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক পরামর্শের বদলে বাণিজ্যিক স্বার্থনির্ভর পরামর্শ পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

কৃষকের কাছে দোকান সহজলভ্য এবং বিক্রেতা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পণ্যের নাম ও ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে যিনি পণ্য বিক্রি করে আয় করেন, তাঁর পরামর্শ সব সময় কৃষকের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেবে কি না—এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীকে অভিযুক্ত করার নয়; বরং কৃষি পরামর্শ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত দূর করার বিষয়।

রোগ-পোকার ভুল শনাক্তকরণে বাড়তে পারে ক্ষতি

জমিতে পোকা, রোগ, পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া, গাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া কিংবা ফলন কমার পেছনে সব সময় কীটপতঙ্গের আক্রমণ দায়ী নয়। পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত পানি, মাটির পিএইচের সমস্যা, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনাও এসব সমস্যার কারণ হতে পারে।

কিন্তু সমস্যা নির্ণয়ের আগে যদি শুধু কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়, তাহলে কৃষক সাময়িকভাবে একটি পণ্য ব্যবহার করলেও মূল কারণ অজানাই থেকে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে একই সমস্যা দেখা দিলে আবারও নতুন পণ্য ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

তাই রোগ বা পোকার সঠিক শনাক্তকরণ, ফসলের বয়স, আবহাওয়া, মাটির অবস্থা, আগে ব্যবহৃত বালাইনাশক এবং আক্রান্তির মাত্রা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

‘পোকা দেখলেই কীটনাশক’ সমাধান নয়

কৃষি উৎপাদনে কীটনাশকের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর ভুল বা অতিরিক্ত ব্যবহার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সক্রিয় উপাদান বা একই ধরনের বালাইনাশক বারবার ব্যবহার করলে ক্ষতিকর পোকার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে পরবর্তী সময়ে আরও বেশি মাত্রায় বা শক্তিশালী বালাইনাশক ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারে ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি পরাগায়নকারী, শিকারি ও পরজীবীসহ উপকারী পোকামাকড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রাকৃতিকভাবে বালাই নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় তাই প্রথমে সমস্যার কারণ শনাক্ত করতে হবে। আক্রান্তির মাত্রা অর্থনৈতিক ক্ষতির সীমা অতিক্রম করেছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এরপর সাংস্কৃতিক, যান্ত্রিক, জৈবিক এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রাসায়নিক পদ্ধতির সমন্বয়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কৃষি কর্মকর্তার সেবা আরও সহজলভ্য করার তাগিদ

কৃষকের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের নিয়মিত যোগাযোগ কার্যকর কৃষি পরামর্শের অন্যতম ভিত্তি। তবে জনবল সংকট, বিপুলসংখ্যক কৃষক, বিস্তীর্ণ কর্মএলাকা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কৃষি সমস্যার কারণে সরকারি সেবা সব কৃষকের কাছে সমানভাবে পৌঁছানো কঠিন।

অন্যদিকে প্রায় প্রতিটি বাজারেই কৃষি উপকরণের দোকান থাকায় কৃষক সহজেই সেখানে পরামর্শ নিতে পারেন। এ বাস্তবতায় কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের বাদ দেওয়ার পরিবর্তে প্রশিক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত কৃষি-পরামর্শ সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

এ জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা যাচাই, সনদায়ন এবং দায়িত্বশীলতার ব্যবস্থা জরুরি। পণ্য বিক্রির স্বার্থ যেন কৃষকের প্রকৃত প্রয়োজনের ওপর প্রাধান্য না পায়, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ হতে পারে কার্যকর মাধ্যম

স্মার্টফোনভিত্তিক কৃষি পরামর্শব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কৃষক ফসলের ছবি, জমির তথ্য, অবস্থান ও আবহাওয়ার তথ্য দিয়ে রোগ-পোকার প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং করণীয় জানতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আবহাওয়ার তথ্য, মাটি পরীক্ষা, আইওটি সেন্সর ও কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ সমন্বিত করে এমন সেবা আরও কার্যকর করা সম্ভব।

তবে প্রযুক্তিকে মাঠকর্মী বা বিশেষজ্ঞের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

একই সঙ্গে কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের লাইসেন্স নবায়নের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও সনদায়ন যুক্ত করা যেতে পারে। কোন রোগে কোন পণ্য প্রয়োজন, কখন প্রয়োগ করতে হবে, কী মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে এবং ফসল সংগ্রহের আগে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে—এসব বিষয়ে নির্ভুল জ্ঞান ছাড়া পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

কৃষকের জন্য প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক সেবা

কৃষকের ভুল সিদ্ধান্তকে শুধু কৃষকের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাঁকে সহজলভ্য, নির্ভরযোগ্য ও নিরপেক্ষ তথ্য দিতে হবে। কৃষক যদি কৃষি কর্মকর্তার পরিবর্তে বাধ্য হয়ে বাণিজ্যিক উৎসের ওপর বেশি নির্ভর করেন, সেটি কৃষি সম্প্রসারণ ও জ্ঞানসেবা ব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

তাই প্রতিটি ইউনিয়ন ও বাজার পর্যায়ে কৃষি পরামর্শের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সনদায়ন, বালাইনাশক ব্যবহারে নির্দেশনাভিত্তিক ব্যবস্থা, রোগ-পোকার সঠিক শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল কৃষি পরামর্শব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

কারণ ভুল পরামর্শের প্রভাব শুধু একটি ভুল পণ্য কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে কৃষকের অর্থ, ফসল, মাটি, পরিবেশ এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার খাদ্যনিরাপত্তাও জড়িয়ে আছে। কৃষকের প্রয়োজন শুধু কীটনাশকের নাম নয়; প্রয়োজন সমস্যার সঠিক কারণ নির্ণয়, কার্যকর সমাধান এবং কখন কী করতে হবে তার নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা। তাই কৃষকের হাতে পণ্য তুলে দেওয়ার আগে নিশ্চিত করতে হবে—সবার আগে পৌঁছাক সঠিক কৃষি জ্ঞান।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad