রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
সাজা বাড়ানোর উদ্যোগগত ৩০ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই রায়ে দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের আনা আট অভিযোগের মধ্যে তৃতীয় অভিযোগে ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগেও তাকে ১০ বছর করে কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রতিটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এসব সাজা আলাদাভাবে হলেও তা একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ায় মোট ১০ বছরই কারাভোগ করতে হবে তাকে। অপরদিকে ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের দাবি, সাজা অপর্যাপ্ত হওয়ায় তা বাড়ানোর জন্যই আপিল করা হচ্ছে।
যেভাবে শুরু হয় বিচারআন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২ নভেম্বর আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ৩০ নভেম্বর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় এবং ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে ১০ জন সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন দুজন। চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথমে আসামিপক্ষ এবং পরে প্রসিকিউশন যুক্তি উপস্থাপন করে। ১৪ মে যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
যেসব অভিযোগ আনা হয়প্রসিকিউশনের আট অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাউ’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের বিএনপি-জামায়াত ও সন্ত্রাসী-জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগে উসকানি দেন ইনু।
এরপর ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নিয়ে আন্দোলন দমনে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০ জুলাই আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন ইনু। এরপর কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ১৪ দলীয় জোটের সমর্থকদের গুলিতে ছয়জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখের নাম উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।
এ ছাড়া আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বোমা হামলা, আটক ও নির্যাতনের পরিকল্পনা এবং কারফিউ জারির মাধ্যমে সহিংসতা চালানোর ক্ষেত্রে ইনুর ভূমিকার অভিযোগও আনা হয়েছে।
২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জোটের আরেকটি সভায় ইনুর উপস্থিতি এবং সেখানে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের প্রস্তাব দেওয়ার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যা ও নির্যাতনকে উৎসাহিত ও বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক