৫ জুলাই নোয়াখালী থেকে ঢাকায় আসি। পরদিন দুপুর ১২টায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইট থাকায় সকাল ১০টায় বাসা থেকে সিএনজিতে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দিই। প্রায় এক ঘণ্টা ১৫ মিনিটে পৌঁছে যাই বিমানবন্দরে।
নির্ধারিত সময়ে ফ্লাইট ছেড়ে যায় এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরেও পৌঁছাই সময়মতো। তবে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি হওয়ায় বিমান থেকে নামতে কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়। পরে বৃষ্টির মধ্যেই হোটেলে পৌঁছে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিই।
বৃষ্টি উপেক্ষা করে সৈকতেহোটেলে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না। বাইরে তখনো টানা বৃষ্টি। জানতে পারলাম, ৪ নম্বর সতর্কসংকেত চলছে। বিষয়টি চিন্তার কারণ হলেও সমুদ্র দেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। বাবাকে সৈকতে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করতে থাকি। শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের নিয়ে বের হন।
প্রথমে যাই কলাতলী বিচে। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে। চারদিকে অন্ধকার, সমুদ্রের গর্জন আর বৃষ্টির শব্দ—সব মিলিয়ে পরিবেশ ছিল অন্য রকম। প্রায় দুই ঘণ্টা সেখানে কাটাই। ছোট ভাই নায়ীব প্রথমে ঢেউয়ের শব্দ ও বৃষ্টিতে কিছুটা ভয় পেলেও পরিবারের সবাইকে পাশে পেয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
সৈকত থেকে হোটেলে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে নিই। দিনের ক্লান্তি থাকলেও মনজুড়ে ছিল সমুদ্র দেখার আনন্দ।
সুগন্ধা থেকে ইনানী—পথজুড়ে প্রকৃতির সৌন্দর্যপরদিন সকালে ঘুরে দেখি সুগন্ধা ও লাবণী বিচ। এরপর সিএনজিতে করে রওনা হই ইনানী বিচের উদ্দেশে। যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। যাতায়াতে ভাড়া দিতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকা।
ইনানীর পথে এক পাশে পাহাড়, অন্য পাশে বিশাল সমুদ্র। বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করে। পথের সৌন্দর্য ছোট ভাই নায়ীবও বেশ উপভোগ করছিল।
ইনানী বিচে পৌঁছে প্রথমে পরিবারের চারজন মিলে বিচ বাইকে চড়ি। এরপর সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করার পালা। প্রথমে নায়ীব পানিতে নামতে চাইছিল না। ঢেউ দেখে তার মনে ভয় কাজ করছিল। কিছুক্ষণ পর সেই ভয় কাটিয়ে সে নিজেই ঢেউয়ের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে। তার হাসি আর উচ্ছ্বাস আমাদের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে সমুদ্র উত্তাল থাকলে কিংবা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলে পানিতে নামা উচিত নয়। আনন্দের চেয়ে নিরাপত্তাই গুরুত্বপূর্ণ—এই উপলব্ধিও ভ্রমণের অভিজ্ঞতার অংশ।
রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ডে জলজ জগতের বিস্ময়ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনে রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ডেও ঘুরে দেখি। প্রবেশ টিকিটের জন্য জনপ্রতি ৩০০ টাকা দিতে হয়েছিল। ভেতরে ঢুকেই চোখে পড়ে জলজ পরিবেশের নান্দনিক উপস্থাপনা। পুকুর ও সমুদ্রের তলদেশের আদলে সাজানো পরিবেশে চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল নানা রঙের মাছ।
সেখানে সাগর ও মিঠাপানির প্রায় ১০০ প্রজাতির মাছ ও প্রাণী দেখার সুযোগ হয়। পাশাপাশি উপভোগ করি থ্রিডি শো। তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছিল পরিবারের ছোট সদস্য নায়ীব। রঙিন মাছের চলাফেরা দেখে তার উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
সৈকত ছাড়ার আগে শেষবারের মতো সমুদ্র দেখাঢাকায় ফেরার আগের দিন সকালে আবার সৈকতে যাই। সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ফিরে আসতে মন চাইছিল না। ঢেউয়ের ওঠানামা, বৃষ্টিভেজা বাতাস আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়—সবকিছুই মনে গেঁথে যাচ্ছিল।
সৈকত থেকে কিছুক্ষণ পর সি-ইন বার্মিজ মার্কেটে যাই। সেখান থেকে বাড়ির সবার জন্য বিভিন্ন ধরনের আচার কিনি। এরপর কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই। ঢাকায় পৌঁছে সেখান থেকে নোয়াখালীর পথে যাত্রা করি।
আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তাও জরুরিকক্সবাজারে আমাদের তিন দিনের ভ্রমণে বৃষ্টি ছিল নিত্যসঙ্গী। সমুদ্রের গর্জন, পাহাড়ি পথ, ঢেউ আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটি হয়ে থাকবে স্মরণীয়।
তবে সমুদ্রভ্রমণে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। সৈকতে লাল পতাকা থাকলে বা সমুদ্রে নামার নিষেধাজ্ঞা জারি হলে পানিতে নামা থেকে বিরত থাকতে হবে। লাইফগার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশের নির্দেশনা মানতে হবে এবং জোয়ার-ভাটা ও স্রোতের পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।
কক্সবাজারের সেই তিন দিন আমাকে নতুন করে বুঝিয়েছে, ভ্রমণের আনন্দ শুধু নতুন জায়গা দেখায় নয়; প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করা এবং একসঙ্গে স্মৃতি তৈরি করার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)