স্মার্টফোন ছেড়ে বাটনফোনে ফিরেই বদলে গেল জীবন, বাড়ল সময় ও সম্পর্কের গভীরতা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৩ দুপুর
  • ৪০৯৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সাধারণ ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে মনোযোগ, মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক সম্পর্কের উন্নতি সম্ভব বলে মনে করেন দৃশ্যশিল্পী আগস্ট লাম। তাঁর মতে, স্মার্টফোন থেকে দূরে থাকলে বাস্তব জীবনের প্রতি মনোযোগ বাড়ে, কমে অস্থিরতা এবং নিজের জন্য সময় বের করা সহজ হয়।

স্মার্টফোনের অবিরাম নোটিফিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রলিং এবং অনলাইন জগতে অতিরিক্ত সময় ব্যয়—এসব থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে সীমা টানার কথা ভাবছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের দৃশ্যশিল্পী ও প্রযুক্তিসচেতন সমাজকর্মী আগস্ট লাম। স্মার্টফোন ছেড়ে সাধারণ বাটনফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমালে জীবন হতে পারে আরও স্বস্তিদায়ক ও অর্থবহ।

লাম তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন ইউ ডোন্ট নিড এ স্মার্টফোন: এ প্র্যাকটিক্যাল গাইড টু ডাউনগ্রেডিং ইউর ফোন অ্যান্ড আপগ্রেডিং ইউর লাইফ শীর্ষক বইয়ে। এতে স্মার্টফোনের ব্যবহার কমানোর যুক্তির পাশাপাশি বিকল্প জীবনযাপনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায়ও তুলে ধরেছেন তিনি।

আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত

স্মার্টফোনে প্রয়োজনীয় কাজের চেয়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে সময় কাটানো বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে নিজের মধ্যে আসক্তির লক্ষণ অনুভব করেন আগস্ট লাম। সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিগত জীবনে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে ২০২২ সালে নিজের ২৭তম জন্মদিনের পর তিনি স্মার্টফোন ব্যবহার বন্ধ করে সাধারণ ফ্লিপ ফোন বেছে নেন।

সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। লাম জানান, স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার আগে তাঁর আশঙ্কা ছিল, পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাবে এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও সংকুচিত হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। তাঁর বন্ধুর সংখ্যা বেড়েছে, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে আরও গভীর।

তাঁর মতে, মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় ফোনের পর্দায় মনোযোগ না থাকলে পারস্পরিক যোগাযোগে আন্তরিকতা বাড়ে। সামনাসামনি কথোপকথনে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়। অন্যদিকে, সামাজিক পরিবেশে থেকেও স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকলে মানুষ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

সামাজিক যোগাযোগে ফিরেছে আন্তরিকতা

স্মার্টফোন না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ছবি বা ব্যক্তিগত খবর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানার সুযোগ আর নেই লামের। ফলে বন্ধুবান্ধবকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানাতে সরাসরি ফোন করতে হয় কিংবা সামনাসামনি কথা বলতে হয়।

শুরুতে বিষয়টি কিছুটা অসুবিধাজনক মনে হলেও পরে এটিকে ইতিবাচক অভ্যাস হিসেবে দেখেছেন তিনি। এতে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গে সরাসরি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নতুন পরিচিতদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হওয়ার বদলে সরাসরি দেখা করার পরিকল্পনা করা কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর প্রবণতা বেড়েছে। লামের মতে, এতে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া আরও স্বাভাবিক ও অর্থবহ হয়েছে।

মানসিক চাপ সামলানোর বিকল্প উপায়

মন খারাপ, একাকিত্ব কিংবা মানসিক চাপ অনুভব করলে অনেকেই অভ্যাসবশত স্মার্টফোন হাতে নেন। লাম জানান, ফোন ব্যবহার বন্ধ করার পর প্রথম দিকে নিজের অনুভূতির মুখোমুখি হওয়া কঠিন মনে হতো। তবে ধীরে ধীরে তিনি বিকল্প অভ্যাস গড়ে তোলেন।

মন খারাপ হলে বন্ধুকে ফোন করা, বই পড়া, হাঁটতে বের হওয়া কিংবা গান শোনার মতো কাজ তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। এতে নেতিবাচক অনুভূতি থেকে সাময়িকভাবে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সেগুলোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শিখেছেন তিনি।

তাঁর অভিজ্ঞতায়, নিজের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠলে অস্বস্তিকর অনুভূতিও আগের মতো ভীতিকর মনে হয় না।

স্ক্রিন টাইম কমলে বাড়ে নিজের জন্য সময়

স্মার্টফোন সময় বাঁচায়—এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও লামের মতে, অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রলিং ও বারবার নোটিফিকেশন পরীক্ষা করার অভ্যাস উল্টো সময় নষ্ট করে। একটি বার্তার উত্তর দিতে গিয়ে খবর দেখা, সেখান থেকে অন্য কনটেন্টে চলে যাওয়া—এভাবে অল্প অল্প করে প্রতিদিন অনেকটা সময় হারিয়ে যায়।

স্মার্টফোনের ব্যবহার কমানোর পর তিনি নিজের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য বেশি সময় পাচ্ছেন বলে জানান। অনলাইনে করা যায় এমন কিছু কাজ সরাসরি সম্পন্ন করতে সামান্য অতিরিক্ত সময় লাগলেও সেগুলোর মাধ্যমে হাঁটাচলা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং বাইরের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ তৈরি হয়।

তাঁর মতে, ব্যস্ততার অনুভূতি সব সময় বাস্তব কাজের পরিমাণের প্রতিফলন নয়। ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে দিনের শেষে নিজের জন্য কয়েক ঘণ্টা সময় বের করাও সম্ভব হতে পারে।

নেভিগেশনে নির্ভরতা কমিয়ে আত্মবিশ্বাস

স্মার্টফোনের জিপিএস ও অন্যান্য ডিজিটাল সুবিধার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের নিজস্ব দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করেন লাম। তাঁর মতে, মানুষ অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য মনে রাখা এবং পথ চিনে নেওয়ার মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

স্মার্টফোন ছাড়ার পর নিজের স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন বলেও জানান তিনি। তবে এ অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে একই রকম হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

কিশোরদের স্ক্রিন টাইম নিয়েও উদ্বেগ

স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের পেছনে রয়েছে শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় ডিজিটাল পর্দায় কাটানোর বিষয়টিও। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেলের কার্যালয়ের পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশটির ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা প্রতিদিন গড়ে আট ঘণ্টার বেশি সময় বিভিন্ন ডিজিটাল পর্দায় কাটায়।

অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এর প্রভাব ব্যবহারের ধরন, বয়স ও অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

এক মাস চেষ্টা করার পরামর্শ

যাঁরা মনে করেন স্মার্টফোন ছাড়া দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করা অসম্ভব, তাঁদের অন্তত এক মাস সাধারণ বাটনফোন ব্যবহার করে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন লাম। তাঁর মতে, চেষ্টা না করেই স্মার্টফোন ছাড়া চলবে না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

তবে চিকিৎসার প্রয়োজনে স্মার্টফোনের কোনো অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে সেটি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ফোনকে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে স্মার্টফোনকে প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট কাজে সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে।

লামের অভিজ্ঞতা থেকে মূল শিক্ষা হলো, প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করাই একমাত্র সমাধান নয়; বরং প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তব জীবনের মানুষ, কাজ ও অভিজ্ঞতার জন্য আরও বেশি মনোযোগী হওয়াই হতে পারে সুস্থ জীবনযাপনের একটি কার্যকর পথ।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর অনলাইন, ১২ অক্টোবর ২০২৬; আগস্ট লামের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন, সিএনএন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad