হাড় ক্ষয় ঠেকাতে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম, অবহেলা বাড়ায় ভাঙার ঝুঁকি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১১ দুপুর
  • ২০৮৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
আজ ২০ অক্টোবর, বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস। হাড়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের আগেভাগে শনাক্ত করা এবং হাড় ভাঙার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করতে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের (আইওএফ) উদ্যোগে পালিত এ দিবসে বিশেষজ্ঞরা হাড়ের ক্ষয় রোধে সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেন।

অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে হাড়ের ঘনত্ব ও গঠনগত শক্তি কমে হাড় দুর্বল এবং ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। রোগটি দীর্ঘদিন নীরবে অগ্রসর হতে পারে। শুরুতে সাধারণত স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে সামান্য আঘাত বা অল্প উচ্চতা থেকে পড়ে হাড় ভাঙার পর অনেকেই প্রথম জানতে পারেন, তাঁদের হাড়ের ঘনত্ব কমে গেছে। এ কারণে রোগটিকে ‘নীরব রোগ’ বলা হয়।

আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২০ কোটি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি তিন নারীর একজন এবং প্রতি পাঁচ পুরুষের একজন জীবদ্দশায় অস্টিওপোরোসিসজনিত হাড় ভাঙার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর ৮৯ লাখের বেশি হাড় ভাঙার ঘটনা এ রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কেন বাড়ে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি

বয়স বৃদ্ধি, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অস্টিওপোরোসিসের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। সাধারণত বিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে হাড় সর্বোচ্চ ঘনত্ব অর্জন করে। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমতে পারে।

নারীদের মেনোপজের সময় ও পরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড় ক্ষয়ের গতি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের অভাব হাড়ের গঠন এবং পেশির শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ভিটামিন ডির ঘাটতিতে শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ ব্যাহত হয়।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং কর্টিকোস্টেরয়েডজাতীয় কিছু ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করলেও হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বয়সের সঙ্গে পেশির শক্তি ও ভারসাম্য কমে গেলে পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।

হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে যা করবেন

ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান: হাড়ের গঠন ও শক্তি বজায় রাখতে ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডাল, সয়াবিন, বাদামসহ পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন। পেশির শক্তি ধরে রাখতে পর্যাপ্ত প্রোটিনও প্রয়োজন।

ভিটামিন ডির ঘাটতি পূরণ করুন: ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। নিরাপদ উপায়ে সূর্যের আলো গ্রহণ ও খাবারের মাধ্যমে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করুন। ঘাটতির আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও সম্পূরক গ্রহণ করা যেতে পারে।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন: হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এবং শরীরের ওজন বহনকারী ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পাশাপাশি পেশি শক্তিশালী করা ও ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলন পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম বেছে নেওয়া উচিত।

ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করুন: এসব অভ্যাস হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান বন্ধ করা এবং মদ্যপান এড়িয়ে চলা জরুরি।

প্রয়োজনে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করান: বয়স, মেনোপজ, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসক হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। ডিএক্সএ (DXA) স্ক্যানের মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপ করা হয়। বিশেষ করে সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে গেলে অস্টিওপোরোসিসের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমান: বাড়িতে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা, বাথরুমে হাতল বসানো, পিচ্ছিল মেঝে এড়িয়ে চলা এবং চলাচলের পথে আলগা কার্পেট ও বৈদ্যুতিক তার সরিয়ে রাখা জরুরি। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থা হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন

হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং পুষ্টির ঘাটতি অবহেলা করা যাবে না। চিকিৎসকের নিষেধ না থাকলে নিয়মিত চলাফেরা ও ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে।

নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডির সম্পূরক গ্রহণ করাও ঠিক নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ ক্ষতির কারণ হতে পারে। একইভাবে, দীর্ঘদিন কর্টিকোস্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করলে চিকিৎসকের সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

দীর্ঘস্থায়ী হাড়ের ব্যথা, উচ্চতা কমে যাওয়া কিংবা মেরুদণ্ডের গঠন পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এসব লক্ষণের অন্য কারণও থাকতে পারে; শুধু উপসর্গ দেখে অস্টিওপোরোসিস নিশ্চিত করা যায় না।

হাড় ভাঙার পরও প্রয়োজন মূল রোগের চিকিৎসা

অস্টিওপোরোসিস মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জ হলো হাড় ভাঙার পর অন্তর্নিহিত কারণ শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। অনেক ক্ষেত্রে হাড় ভাঙার জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হলেও রোগীর হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা বা পুনরায় হাড় ভাঙা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

এ ঘাটতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশন ‘ফ্র্যাকচার লিয়াজোঁ সার্ভিসেস’ (এফএলএস) ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়। হাসপাতালভিত্তিক এ সমন্বিত সেবার মাধ্যমে হাড় ভাঙার পর রোগীর ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে গেলে অস্টিওপোরোসিসের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ, একবার হাড় ভাঙার পর যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আবার হাড় ভাঙার ঝুঁকি থেকে যায়।

কোমরের হাড় ভাঙলে জটিলতা আরও গুরুতর হতে পারে। অনেক রোগীর স্বাভাবিক চলাফেরার সক্ষমতা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। এতে রোগী ও পরিবারের ওপর শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি হয়।

বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসের মূল বার্তা হলো—হাড় দুর্বল হওয়ার অপেক্ষা না করে আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, প্রয়োজন অনুযায়ী হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা এবং হাড় ভাঙার পর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অস্টিওপোরোসিসজনিত জটিলতা ও পুনরায় হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad