শীতের মৌসুমে সর্দি-কাশি এড়াতে অনেকেই নিয়মিত ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। প্রচলিত ধারণা, এই ভিটামিন ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধ করে এবং দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ করলেও সাধারণ মানুষের সর্দি লাগার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে—এমন জোরালো প্রমাণ নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি সর্দির উপসর্গের স্থায়িত্ব সামান্য কমাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী ভিটামিন সি গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। এতে হজমের সমস্যা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ভিটামিন সি নিয়ে ধারণার সূত্রপাতভিটামিন সি ও সর্দি-কাশি নিয়ে ব্যাপক প্রচারণার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মার্কিন রসায়নবিদ লিনুস পোলিংয়ের। তিনি ১৯৫৪ সালে রসায়নে এবং ১৯৬২ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ে সর্দি প্রতিরোধে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ২ হাজার মিলিগ্রাম ভিটামিন সি গ্রহণের কথা বলা হয়।
পোলিংয়ের সেই বক্তব্য ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্টের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তবে পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ মানুষের সর্দি প্রতিরোধে উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি যে কার্যকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
নিয়মিত খেলে কী উপকার হয়?গবেষণার ফল অনুযায়ী, নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ সাধারণ মানুষের সর্দি হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায় না। তবে সর্দি হলে উপসর্গ কত দিন স্থায়ী হয়, সে ক্ষেত্রে সামান্য উপকার পাওয়া যেতে পারে।
নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে সর্দির স্থায়িত্ব গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ কমতে পারে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে; শিশুদের ক্ষেত্রে হ্রাসের হার কিছুটা বেশি হতে পারে। ফলে উপকার থাকলেও তা সীমিত—সর্দি পুরোপুরি ঠেকানো বা দ্রুত সারিয়ে তোলার নিশ্চয়তা নয়।
অন্যদিকে, সর্দির উপসর্গ শুরু হওয়ার পর ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ শুরু করলে অসুস্থতার স্থায়িত্ব বা তীব্রতা কমে—এমন ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তীব্র শারীরিক পরিশ্রমে যুক্ত কিছু মানুষ, যেমন ম্যারাথন দৌড়বিদ ও বিশেষ প্রশিক্ষণে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণে সর্দির ঝুঁকি কমার কিছু প্রমাণ রয়েছে।
দৈনিক কতটুকু ভিটামিন সি প্রয়োজন?শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সুষম খাদ্য গ্রহণ। লেবু, কমলা, পেয়ারা, আমলকী, পেঁপে, টমেটো এবং বিভিন্ন শাকসবজিতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ভিটামিন সি প্রয়োজন বয়স ও লিঙ্গভেদে ভিন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক প্রয়োজন ৯০ মিলিগ্রাম এবং নারীর ৭৫ মিলিগ্রাম। ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও ৩৫ মিলিগ্রাম বেশি। গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের সময়ও প্রয়োজনের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভিটামিন সি গ্রহণের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা দৈনিক ২ হাজার মিলিগ্রাম। এটি প্রয়োজনীয় দৈনিক মাত্রা নয়; বরং অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত গ্রহণের ঝুঁকি বিবেচনায় নির্ধারিত সীমা।
অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্টে যেসব ঝুঁকিপ্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভিটামিন সি গ্রহণ করলে কয়েক ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন—
ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব ও পেটে ব্যথা বা মোচড়।
পেট ফাঁপা এবং হজমের অস্বস্তি।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে, বিশেষত আগে থেকে কিডনির সমস্যা থাকলে।
শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আয়রন শোষণ বেড়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কিছু চিকিৎসা বা ওষুধের সঙ্গে উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্টের পারস্পরিক প্রভাবও থাকতে পারে। ক্যানসারের চিকিৎসা চললে বা নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সুষম খাদ্যই প্রথম পছন্দভিটামিন সি শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, কোলাজেন তৈরি এবং ক্ষত সারাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন গ্রহণ করলেই যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে বা সর্দি-কাশি দূর হবে, এমন নয়।
তাই সর্দি-কাশি প্রতিরোধের আশায় উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর না করে পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া উচিত। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক