শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি শিশুর জ্ঞান, মেধা, মনন, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতা বিকাশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। পরিবারে বাবা-মায়ের পর শিক্ষকেরাই শিশুদের পথপ্রদর্শক ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বিদ্যালয় ও মাদরাসায় শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এবং এ ধরনের ঘটনার খবর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যে শিক্ষকের দায়িত্ব শিশুকে স্নেহ, মমতা ও যত্নের মধ্য দিয়ে আলোর পথে এগিয়ে নেওয়া, তাঁর হাতেই কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তা ব্যক্তি, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। ইসলাম শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুরা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ আমানত। তাদের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা ও দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রত্যেকের কর্তব্য। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি কোমল আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, শিশুদের অবহেলা, অপমান কিংবা নির্যাতন ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের পরিপন্থী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন। শিশুদের দেখলে তিনি আগে সালাম দিতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) দীর্ঘ ১০ বছর তাঁর সান্নিধ্যে ছিলেন। এ সময়ে মহানবী (সা.) তাঁর সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর এই জীবনাদর্শ শিক্ষকদের জন্যও অনুসরণীয়। অথচ কিছু ব্যক্তির অনৈতিক ও দায়িত্বহীন আচরণের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক পেশার আড়ালে কোনো ধরনের নির্যাতন বা অসদাচরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শিশুর ওপর নির্যাতন কেবল তার শারীরিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে তার মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর পড়তে পারে। ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ আদমসন্তানকে মর্যাদা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। সূরা বনি ইসরাইলের ৭০ নম্বর আয়াতে মানবজাতির মর্যাদার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
সুতরাং কোনো শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করা তার মানবিক মর্যাদার ওপর আঘাতের শামিল। বিদায় হজের ভাষণেও মহানবী (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পবিত্রতার কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ইসলামের এই শিক্ষা অনুসারে শিশুদের সম্মান, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
ইসলাম সব ধরনের অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও যৌন নিপীড়নকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ইসরাইলের ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।’ এই নির্দেশনা মানুষের নৈতিক চরিত্র ও পবিত্রতা রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ, অসৎ উদ্দেশ্য কিংবা যৌন হয়রানি গুরুতর নৈতিক অপরাধ এবং আমানতের খেয়ানত।
শিক্ষকতা একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রাখেন। পবিত্র কোরআনে আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিসের আলোকে একজন শিক্ষক তাঁর কাছে থাকা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়ে দায়িত্বশীল। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ, তাদের ব্যক্তিগত সীমানার প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা শিক্ষকের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্বের অংশ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও জবাবদিহি। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার পাশাপাশি প্রার্থীর নৈতিকতা, চরিত্র ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষানীতি প্রণয়ন, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
অভিভাবকদেরও সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তারা নির্ভয়ে বিষয়টি জানাতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক, আলেম-ওলামা ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে শিশুদের নিরাপত্তায় সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গোপন বা উপেক্ষা না করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ইসলামের শিক্ষা হলো—দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। তাই শিশুদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ভালোবাসাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে। তাদের নিরাপত্তা, সুস্থ বিকাশ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারলেই গড়ে উঠবে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও আদর্শ সমাজ।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক