হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ, মান যাচাইয়ে কঠোর নজরদারির দাবি বিশেষজ্ঞদের

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০৮ দুপুর
  • ২৯১৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় ৩০৯ শিশুর মধ্যে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশের ফল নেগেটিভ, টিকা উৎপাদন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের আহ্বান

বাংলাদেশে হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিন বিশেষজ্ঞ। তাঁদের দাবি, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় টিকা নেওয়া শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি। এ পরিস্থিতিতে টিকার উৎপাদনগত মান, কার্যকারিতা ও ব্যাচভিত্তিক গুণগত সামঞ্জস্য যাচাইয়ের পাশাপাশি টিকা নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দৈনিক আমার দেশ-এর উপসম্পাদকীয়তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন ড. রেজাউল করিম, ড. জুবায়ের রহমান ও ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন।

নিবন্ধে লেখকরা ২৭ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত আইইডিসিআরের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করেন। তাঁদের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির পর সেপ্টেম্বরে ৩০৯ শিশুর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এতে ৮৫ শিশুর (২৭ দশমিক ৫ শতাংশ) শরীরে হামের অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি। আরও ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর ফল ছিল অনিশ্চিত বা বর্ডারলাইন। বিপরীতে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশুর পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে।

লেখকদের মতে, এই ফল টিকার উৎপাদনগত মান, দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিদেশি টিকার অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন

নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে সাধারণত MR টিকা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধে MMR এবং জলবসন্তসহ MMRV টিকা ব্যবহৃত হয়।

লেখকদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে FDA-অনুমোদিত টিকার মধ্যে রয়েছে GSK-এর PRIORIX, Merck-এর M-M-R II ও ProQuad। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত রয়েছে M-M-RVAXPRO এবং Priorix-Tetra। বাংলাদেশে ব্যবহৃত ভারতের Serum Institute of India (SII) ও Biological E-এর MR টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রাক্‌যোগ্যতা পেলেও ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা যুক্তরাজ্যে নিয়মিত বাজারজাতকরণের অনুমোদন পায়নি বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

লেখকদের মতে, WHO-এর প্রাক্‌যোগ্যতার পাশাপাশি FDA ও ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নকেও টিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

আগের গবেষণা ও সাম্প্রতিক ফলের ব্যবধান

নিবন্ধে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বির (icddr,b) আগের গবেষণার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। লেখকদের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সালে পরিচালিত একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল ২০২৫ সালে দ্য ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ওই গবেষণায় ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়া ২৯২ শিশুর প্রায় সবার শরীরেই হামের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক জরিপে অ্যান্টিবডি পজিটিভ পাওয়ার হার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। লেখকদের মতে, আগের গবেষণার ফলের সঙ্গে এই ব্যবধান টিকার উৎপাদন ও গুণগত মানের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

উৎপাদন ও সংরক্ষণব্যবস্থা যাচাইয়ের তাগিদ

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, হামের টিকা জীবন্ত দুর্বলকৃত ভাইরাস দিয়ে তৈরি হওয়ায় উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তনও এর গুণগত মানে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি উৎপাদন ব্যাচের মান ও কার্যকারিতা একই পর্যায়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অপুষ্টি, কম বয়স কিংবা কোল্ড চেইনের ত্রুটিকে সাম্প্রতিক ফলের প্রধান কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার পক্ষেও পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই বলে নিবন্ধে মত দিয়েছেন লেখকরা। তাঁদের উদ্ধৃত আগের গবেষণায় অপুষ্টির উপস্থিতি সত্ত্বেও অধিকাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁরা বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির সংরক্ষণব্যবস্থার সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে বলেন, নির্দিষ্ট তাপমাত্রাগত ত্রুটির প্রমাণ ছাড়া কোল্ড চেইনকে দায়ী করা ঠিক হবে না।

স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া ও স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর আহ্বান

টিকা নির্বাচন ও ক্রয়ের সিদ্ধান্ত স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিন লেখক। তাঁদের মতে, টিকার গুণগত মান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, ক্লিনিক্যাল ও নন-ক্লিনিক্যাল গবেষণার তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের টিকা নিয়ে গবেষণা বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যুক্ত ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

লেখকরা FDA ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত MMR টিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে এসব টিকা কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ, ইউনিসেফ ও প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেছেন তাঁরা।

উপসংহারে লেখকরা বলেন, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু দাম বা ডোজের সংখ্যা নয়, প্রতিটি ডোজের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নে টিকার মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না।

তথ্যসূত্র: ড. রেজাউল করিম, ড. জুবায়ের রহমান ও ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেনের।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad