আড়াই শতকের ঐতিহ্য: কটিয়াদীর পঞ্চায়েতে কোরবানির গোশত পৌঁছায় প্রতিটি পরিবারের ঘরে
ঈদুল আজহার আনন্দ শুধু কোরবানি পালনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ভাগাভাগি, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়েও ছড়িয়ে পড়ে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর এলাকার পূর্বপাড়া মহল্লায় প্রায় আড়াই শত বছরের পুরোনো একটি পঞ্চায়েত প্রথা সেই মানবিকতারই অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এখানে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে সমাজের মানুষ সম্মিলিতভাবে কোরবানির গোশত বণ্টন করেন, যা পৌঁছে যায় সমাজের প্রতিটি পরিবারের ঘরে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বপাড়া মহল্লার এই পঞ্চায়েতভিত্তিক গোশত বণ্টন ব্যবস্থা ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসছে। সমাজে বৈষম্য কমানো, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ঈদের আনন্দ সবার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ প্রথার সূচনা হয়েছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখনো তা অব্যাহত রয়েছে।
ঈদের নামাজ শেষে শুরু হয় গোশত সংগ্রহ ও বণ্টনের কার্যক্রম। সমাজের কোরবানিদাতারা তাদের কোরবানির পশুর নির্ধারিত অংশ পঞ্চায়েতের মাঠে জমা দেন। পরে স্বেচ্ছাসেবকেরা সেগুলো সংগ্রহ করে ওজনের ভিত্তিতে সমানভাবে ভাগ করেন। তালিকা অনুযায়ী প্রতিটি পরিবারের জন্য গোশত নির্ধারণ করা হয় এবং কেউ উপস্থিত না থাকলেও তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় প্রাপ্য অংশ।
এ বছর পঞ্চায়েতের আওতাভুক্ত ৫৭০টি পরিবারের মধ্যে কোরবানির গোশত বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সমাজের প্রায় ৪০ থেকে ৪৬টি পরিবার প্রতিবছর কোরবানি দেয়। বাকি পরিবারগুলো বিভিন্ন কারণে কোরবানি দিতে না পারলেও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় না। পঞ্চায়েতের উদ্যোগে সবার ঘরেই পৌঁছে যায় কোরবানির মাংস।
এলাকার বাসিন্দা নুরুল্লাহ বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই বণ্টন প্রথা দেখে আসছি। আমাদের পূর্বপুরুষরাও একইভাবে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে গোশত বণ্টন করতেন। বহু বছর ধরে এটি চলে আসছে।”
গোশত বণ্টনের দায়িত্বে থাকা শরিফ, মিজান ও আব্দুল্লাহ জানান, “এ বছর ৫৭০টি পরিবারের তালিকা অনুযায়ী গোশত বিতরণ করা হয়েছে। কেউ নিতে না এলে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক ঐক্য বজায় রাখা এবং ধনী-গরিবের ব্যবধান কমানোই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
স্থানীয়রা জানান, কোরবানিদাতারা তাদের পশুর মাংসের একটি অংশ এবং পশুর চামড়া পঞ্চায়েতের কাছে জমা দেন। পরে স্বেচ্ছাসেবকেরা সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে সমানভাবে বণ্টন করেন। এই ব্যবস্থায় কোরবানি দেওয়া ও না-দেওয়া—উভয় শ্রেণির পরিবারই গোশত পেয়ে থাকে।
আধুনিক সময়ে পঞ্চায়েতভিত্তিক সমাজব্যবস্থা অনেক জায়গায় বিলুপ্ত হলেও কটিয়াদীর পূর্বপাড়া মহল্লায় এখনো টিকে আছে এর মানবিক ও সামাজিক রূপ। স্থানীয়দের মতে, এই ঐতিহ্য শুধু কোরবানির গোশত বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সাম্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ঈদুল আজহায় তাই কটিয়াদীর পূর্বপাড়া মহল্লা হয়ে ওঠে এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে কোরবানির আনন্দ ভাগাভাগি হয় সবার মধ্যে, আর কোনো পরিবারই থাকে না বঞ্চিত।

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ