সলঙ্গা থানা সেচ্ছাসেবকলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ও সিরাজগঞ্জ জেলা পিকআপ মালিক সমিতির সভাপতি মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজগঞ্জে পুলিশের নাম ব্যবহার করে পিকআপ মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে, যা থেকে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে।
সলঙ্গা থানা সেচ্ছাসেবকলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ও সিরাজগঞ্জ জেলা পিকআপ মালিক সমিতির সভাপতি মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সিরাজগঞ্জে পুলিশের নামে এই চাঁদাবাজি চালাচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, 'সিফাত ট্রান্সপোর্ট এন্ড কমিশন এজেন্ট' নামের একটি কার্ডের মাধ্যমে শতাধিক পরিবহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
তথ্য অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলা পিকআপ মালিক সমিতির সভাপতি মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে প্রতিটি পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যানের জন্য মাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা করে আদায় করছে। চাঁদা আদায়কারীরা চালক ও মালিকদের কাছে দাবি করেন, এই অর্থ পুলিশের বিভিন্ন চেকপোস্টে দিতে হয়। টাকা না দিলে পথে পথে পুলিশ মামলা ও হয়রানি করবে বলেও ভয় দেখানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পিকআপ মালিক বলেন, "মনিরুল ইসলাম সলঙ্গা থানা সেচ্ছাসেবকলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক। তিনি এখন সিরাজগঞ্জ জেলা পিকআপ মালিক সমিতির সভাপতি।
তিনি তার লোকজন দিয়ে 'সিফাত ট্রান্সপোর্ট এন্ড কমিশন এজেন্ট' নামে একটি কার্ডের মাধ্যমে আসান আলীকে দিয়ে মাসে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আদায় করেন।"
তিনি আরও বলেন, "চালকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, এই কার্ড থাকলে দেশের যেকোনো পুলিশ চেকপোস্টে দেখালেই মামলা হবে না। ফলে পুলিশি হয়রানি এড়াতে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দিচ্ছেন।"
পরিবহনসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্ন অজুহাতে গাড়ি আটকে দেওয়া, চলাচলে বাধা সৃষ্টি কিংবা পুলিশি হয়রানির ভয় দেখানো হয়।
অভিযুক্ত মনিরুলের সহকারী চাঁদা আদায়কারী সলঙ্গা থানার ধুবিল গ্রামের আসান আলীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সিরাজগঞ্জ জেলা পিকআপ মালিক সমিতির সভাপতি মনিরুল ভাইয়ের নির্দেশে আমি সিরাজগঞ্জ জেলা, হাটিকুমরুল ও রোড এলাকার ৬০ থেকে ৭০টি গাড়ি থেকে মাসে প্রায় এক লাখ টাকার মতো তুলি। এই টাকা মহাসড়কের বিভিন্ন পুলিশ চেকপোস্টে দেওয়া হয়। মাস শেষে সামান্য কিছু টাকা আমার কাছে থাকে।" তিনি বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করারও অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে সলঙ্গা থানা সেচ্ছাসেবকলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ও সিরাজগঞ্জ জেলা পিকআপ মালিক সমিতির সভাপতি মনিরুল ইসলাম গাড়ি থেকে টাকা তোলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "এই টাকা বিভিন্ন জায়গায় দিতে হয়।
আমি সভাপতি হওয়ায় আমার গাড়িগুলোকে আলাদা করে টাকা দিতে হয় না। এই ব্যবস্থা না থাকলে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে যায়।"
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার চাঁদা আদায়ের দায়িত্বে থাকা আসান আলীর পরিবর্তে তৌহিদ নামে আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, "বিষয়টি আমাদের নজরে এলে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ নেই।"
সিরাজগঞ্জ জেলা ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা সোহেলা রানা বলেন, "সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের নামে অবৈধ অর্থ আদায়ের কোনো বৈধতা নেই। এমন অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
রায়গঞ্জ-সলঙ্গা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম জানান, "পুলিশের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে যদি সত্যিই এমন কিছু ঘটে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলেন, "পুলিশের নাম ভাঙিয়ে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ শুধু পরিবহন খাতেই নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। এ ধরনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি মহাসড়কে চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে পরিবহন মালিক ও চালকরা নিরাপদ ও হয়রানিমুক্তভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।"

মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক