জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর উত্তরায় নিহত শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পূর্তিতে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে তার পরিবার। মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২৬ জনের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম চলমান থাকলেও শুনানি পিছিয়ে যাওয়ায় দ্রুত বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের প্রশাসনিক প্রভাব এবং পরিবারকে অব্যাহত হুমকির অভিযোগও করেছেন মুগ্ধর স্বজনরা।
মুগ্ধর ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছিল। চার্জশিট দাখিল, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ—সবই সে সময় সম্পন্ন হয়। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টানা দুই মাস শুনানি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা তাদের হতাশ করেছে।
তার ভাষ্য, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন বিচার প্রক্রিয়া কেন ধীরগতির, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। চিফ প্রসিকিউটর ও তার টিমে পরিবর্তন হলেও সেটিকে শুনানি বিলম্বের গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে দেখছেন না তারা।
দীপ্ত জানান, ঘটনার পর পুলিশ স্বাভাবিকভাবে তদন্ত পরিচালনা করতে পারবে না—এমন আশঙ্কা থেকে পরিবারের সদস্যরাই এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে একটি বিস্তারিত তথ্যপ্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। কোথা থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, কীভাবে মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং ঘটনাস্থলের গুরুত্বপূর্ণ ভিডিওচিত্র তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাদের দাবি, ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের তথ্যপ্রমাণ এতটাই শক্তিশালী যে উত্তরায় ১৮ ও ১৯ জুলাই নিহত ও আহত অন্যদের মামলাতেও সেগুলো ব্যবহার করা যাবে। অন্য শহীদ পরিবারের স্বার্থ বিবেচনায় বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিলেও এখন তাদের মনে হচ্ছে, এতে বিচার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হয়েছে। তাদের জানানো হয়েছিল, শুধু মুগ্ধ হত্যার মামলা হলে এক মাসের মধ্যেই চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হতো।
বিচার বিলম্বের কারণ হিসেবে দীপ্তের অভিযোগ, অভিযুক্তদের অনেকেই প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় তাদের প্রভাব বিচার কার্যক্রমে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অজুহাতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখা যাচ্ছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
মুগ্ধর পরিবার আরও অভিযোগ করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ফোনকলের মাধ্যমে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জুলাই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
উল্লেখ্য, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ যমজ ভাই। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ২৫ বছর বয়সে নিহত হন মুগ্ধ।
তার মৃত্যুর পর থেকে পুরো পরিবারের জীবনযাত্রা আমূল বদলে গেছে বলে জানান দীপ্ত। তিনি বলেন, তাদের মা এখনো ছেলের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি। ঘুমের মধ্যেও তিনি চিৎকার করে মুগ্ধকে ডাকেন। ঈদ, জন্মদিন কিংবা পারিবারিক বিশেষ দিনগুলো এখন তাদের কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক সময়।
দীপ্ত মনে করেন, শহীদ পরিবারগুলোর প্রকৃত স্বস্তি ফিরবে কেবল ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের ফলে মানুষের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস বেড়েছে। তবে যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই ব্যবস্থার কেবল বাহ্যিক রূপ বদলেছে, ভেতরের কাঠামো এখনো অনেকটাই আগের মতো রয়ে গেছে।

মোঃ আল আমিন হোসেন,বার্তা সম্পাদক