বিমানবন্দরে কাস্টমসের তৎপরতা বেড়েছে, তিন সপ্তাহে আদায় ১৫ কোটির বেশি রাজস্ব

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

চোরাচালান প্রতিরোধ ও শুল্ক ফাঁকি রোধে দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমস স্টেশনগুলোতে অভিযান জোরদার করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। আগস্টের প্রথম তিন সপ্তাহে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বেনাপোল সীমান্তসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ সোনা, বিদেশি সিগারেট, আইফোন, প্রসাধনী, ওষুধ ও মদ জব্দ করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথম তিন সপ্তাহে পরিচালিত অভিযানে ১৫ কোটিরও বেশি টাকার পণ্য জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় অতিরিক্ত শুল্ক ও জরিমানাও আদায় করা হয়েছে।

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, যাত্রী প্রোফাইলিং, গোপন গোয়েন্দা তথ্য এবং শিফটভিত্তিক নিবিড় নজরদারির মাধ্যমে চোরাচালানকারীদের নতুন নতুন কৌশল শনাক্ত করা হচ্ছে। ফলে সোনা ও মূল্যবান পণ্য পাচারে অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করেও পার পাচ্ছেন না চোরাচালানকারীরা।

অন্তর্বাসে সোনা, ট্রলিতে গোপন চেম্বার

সম্প্রতি সোনা ও মূল্যবান পণ্য পাচারে চোরাচালানকারীরা নানা জটিল কৌশল ব্যবহার করছেন। তবে গোয়েন্দা নজরদারির কারণে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে।

গত ১৭ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাইফেরত এক যাত্রীর কাছ থেকে ৮৮১ গ্রাম সোনা পেস্ট জব্দ করা হয়। এর আগে ৩ আগস্ট চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতীয় ও বাংলাদেশি দুই যাত্রীর অন্তর্বাস থেকে মোট ১ হাজার ৫০০ গ্রাম সোনা পেস্ট উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা সোনার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ১৫ আগস্ট শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসের এক যাত্রীর ব্যবহৃত ট্রলির গোপন চেম্বার থেকে ১৩৩ গ্রাম সোনা ও লুকানো অবস্থায় ২ হাজার ৫৮৯ পিস ওষুধ জব্দ করা হয়। ৫ আগস্ট বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের সময় এক ব্যক্তির প্যান্টের পকেটে লুকানো ১০০ গ্রাম সোনাও জব্দ করা হয়।

চট্টগ্রামে বড় সিগারেটের চালান

১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক সময়ের বড় সিগারেটের চালান আটক করে সিআইআইডি। দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ইএ১৪৮ ফ্লাইটে নজরদারি চালিয়ে তিন যাত্রীর কাছ থেকে ৭৮২ কার্টন প্ল্যাটিনাম ও মন্ড সিগারেট এবং ১৩টি আইফোন উদ্ধার করা হয়।

একই ফ্লাইটের ২ নম্বর ব্যাগেজ বেল্টে পড়ে থাকা একটি পরিত্যক্ত ব্যাগেজ থেকে আরও ১ হাজার ২০ কার্টন সিগারেট উদ্ধার করা হয়। এই একক চালানেই শুল্ক-করসহ জব্দ করা পণ্যের মূল্য দাঁড়ায় ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

জব্দ হচ্ছে নিষিদ্ধ প্রসাধনী ও বিদেশি মদ

উচ্চ কর এড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার কারণে বিভিন্ন ফ্লাইটে নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর বিউটি ক্রিম, প্রসাধনসামগ্রী ও মদ আনার প্রবণতাও দেখা গেছে।

গত ১৭ আগস্ট বিমানবন্দরের ফরেন পোস্ট অফিসে অভিযান চালিয়ে ৩১৯ কেজি নিষিদ্ধ বিউটি ক্রিম উদ্ধার করা হয়। ২০ ও ২১ আগস্ট পৃথক অভিযানে শত শত কেজি নিষিদ্ধ গৌরি ক্রিম, ভ্যাপ লিকুইড, মিল্ক পাউডার ও একাধিক আইফোন জব্দ করা হয়।

এর আগে ১২ ও ১৫ আগস্ট এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে আসা একাধিক যাত্রীর লাগেজ থেকে দামি ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ মদ আটক করা হয়।

মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা

শুল্ক ফাঁকি দিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির ঘটনাও শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গত ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সুলতানা করপোরেশনের একটি চালানে বড় ধরনের মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা উদ্ঘাটন করা হয়। এ ঘটনায় ৭১ লাখ ৭২ হাজার ৬০৬ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব ও জরিমানা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জানিয়েছেন, শুল্ক খাতে যথাযথ শুল্কায়ন ও দ্রুত পণ্য খালাস, বকেয়া রাজস্ব আদায় ও মামলা নিষ্পত্তি, বন্ডের অপব্যবহার রোধ এবং সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিলাম কার্যক্রমের গতিও বাড়ানো হবে।

সাড়ে ৫ হাজার ডলারের ঘোষণায় মিলল প্রায় ২ কোটি টাকার পণ্য

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট এলাকায় মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির বিরুদ্ধে আরেকটি বড় সাফল্য পেয়েছে সিআইআইডি। নামমাত্র মূল্য ঘোষণা করে আনা দুটি পৃথক চালানের কায়িক পরীক্ষায় প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা মূল্যের ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, আইপ্যাড ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আটক করা হয়েছে।

এনবিআর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরদার গ্লোবাল ট্রেড নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের খালাসকারী প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ফাহিম ফাইভ স্টার লিমিটেডের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশে আনা হয়।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৩ আগস্ট চালান দুটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। পরে ২৩ আগস্ট প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে চালান দুটির কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।

পরীক্ষায় দেখা যায়, দুটি চালানে থাকা পণ্যের প্রকৃত মূল্য উল্লেখ না করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে মাত্র ৫ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার আমদানি মূল্য ঘোষণা করেছিল। এর বিপরীতে চালান দুটিতে পাওয়া পণ্যের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, গোয়েন্দা নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানের ফলে চোরাচালান এবং শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে। এর পাশাপাশি বৈধ পথে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও প্রবাসী আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতেও এসব কার্যক্রম ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad