এআই দিয়ে তৈরি হলো নতুন কার্যকর ভাইরাস, সামনে চিকিৎসার সম্ভাবনা ও বায়োসেফটির চ্যালেঞ্জ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৪ দুপুর
  • ৪১৩৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আর শুধু লেখা, ছবি কিংবা সফটওয়্যার তৈরির প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকরা জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে নতুন ভাইরাসের জিনোম নকশা তৈরি করেছেন। গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এসব নকশার কিছু কার্যকর ব্যাকটেরিওফাজে রূপ নিয়েছে, যা ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে ধ্বংস করতে সক্ষম।

গবেষণাটিকে জীববিজ্ঞানে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কম্পিউটারে তৈরি জিনগত নকশা বাস্তব জীববৈজ্ঞানিক ব্যবস্থায় কার্যকর করার সক্ষমতা ভবিষ্যতের বায়োসেফটি ও বায়োসিকিউরিটি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এআইয়ের তৈরি জিনোমে কার্যকর ফাজ

গবেষণার কেন্দ্রে ছিল ‘Evo’ সিরিজের জিনোম-ভাষা মডেল। এর মধ্যে Evo-1 এবং পরবর্তী উন্নত সংস্করণ Evo-2 জিনগত তথ্যের কাঠামো ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে নতুন ডিএনএ সিকোয়েন্স তৈরির জন্য তৈরি করা হয়েছে।

স্ট্যানফোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, Evo-এর প্রাথমিক প্রশিক্ষণে বিপুলসংখ্যক প্রোক্যারিওটিক ও ফাজ জিনোম এবং বিপুল পরিমাণ ডিএনএ সিকোয়েন্স ব্যবহার করা হয়। মানুষের সংক্রমণ ঘটাতে পারে—এমন ভাইরাসের জিনোম প্রশিক্ষণ-তথ্য থেকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।

গবেষণায় ব্যাকটেরিওফাজ ΦX174-কে জৈবিক রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এরপর এআইকে এমন নতুন জিনোম নকশা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়, যেগুলো Escherichia coli বা E. coli ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে পারে।

গবেষকদের লক্ষ্য ছিল কোনো প্রাকৃতিক ভাইরাসের হুবহু অনুলিপি তৈরি করা নয়। বরং বিদ্যমান জিনোমের কার্যকর কাঠামো অনুসরণ করে নতুন জিনগত সিকোয়েন্স তৈরি করা।

শত শত নকশার মধ্যে কার্যকর মাত্র ১৬টি

এআই বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য জিনোম নকশা তৈরি করার পর সেগুলোর একটি নির্বাচিত অংশ গবেষণাগারে সংশ্লেষণ ও পরীক্ষা করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০টি নকশা পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ১৬টি কার্যকর ব্যাকটেরিওফাজে পরিণত হয়।

কার্যকর এসব ফাজ E. coli ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে এবং ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমাতে সক্ষম হয়।

তবে এআইয়ের তৈরি অধিকাংশ নকশাই কার্যকর হয়নি। বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য নকশার তুলনায় সফল নকশার সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে গবেষণাটিকে এখনো মূলত ‘proof of concept’ বা ধারণাটির বাস্তব কার্যকারিতার প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মানুষের জন্য ভাইরাস তৈরির উদ্দেশ্য নয়

গবেষণায় তৈরি ভাইরাসগুলো ব্যাকটেরিওফাজ—অর্থাৎ এমন ভাইরাস, যেগুলো ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে। এগুলো মানুষের শরীরে রোগ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি।

গবেষকরা মানুষের সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত ভাইরাসের জিনগত তথ্য প্রশিক্ষণ-তথ্য থেকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছিলেন। ফলে গবেষণাটির মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে নতুন ফাজ তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করা।

তবে গবেষণাটি যে ঝুঁকিমুক্ত, এমনটা বলার সুযোগ নেই। কারণ এই কাজ দেখিয়েছে, জেনারেটিভ এআই দিয়ে কম্পিউটারে তৈরি একটি জিনোম নকশাকে বাস্তব জৈবিক ব্যবস্থায় কার্যকর করা সম্ভব। আর এই সক্ষমতাই ভবিষ্যতে জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার নিরাপত্তা ও অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি করছে।

অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাবনা

গবেষণাটির অন্যতম সম্ভাবনাময় দিক হলো ফাজ থেরাপি। ব্যাকটেরিওফাজ নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে ধ্বংস করতে পারে। এ কারণে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও নির্দিষ্ট ও কার্যকর ফাজ তৈরিতে এআইভিত্তিক জিনোম নকশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ফাজ থেরাপিকে এখনই সব ধরনের ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রতিষ্ঠিত বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট রোগীর জন্য উপযুক্ত ফাজ নির্বাচন এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে।

সামনে বায়োসেফটি ও বায়োসিকিউরিটির প্রশ্ন

গবেষণাটি একদিকে জীবপ্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, অন্যদিকে জৈবনিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতার প্রয়োজনও স্পষ্ট করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যত দ্রুত জিনোম নকশার সক্ষমতা অর্জন করছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণার নিরাপত্তা, নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কম্পিউটারে তৈরি জিনগত নকশা থেকে বাস্তব জৈবিক উপাদান তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই ও নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা জরুরি।

স্ট্যানফোর্ডের গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই গবেষণা দেখাচ্ছে—জেনারেটিভ এআই শুধু বিদ্যমান জিনগত তথ্য বিশ্লেষণেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নতুন জিনোমের নকশাও প্রস্তাব করতে পারে এবং সেই নকশার কিছু বাস্তব জীববৈজ্ঞানিক কার্যকারিতাও পাওয়া সম্ভব।

ফলে এআইনির্ভর জীববিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ও জীবপ্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে দায়িত্বশীল গবেষণা, বায়োসেফটি ও বায়োসিকিউরিটির বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad