এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ঐতিহাসিক বেয়ু ট্যাপেস্ট্রির প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হন বার্নহাম ও ম্যাক্রোঁ। অনুষ্ঠানে রাজা তৃতীয় চার্লসও উপস্থিত ছিলেন। দুই দেশই এ আয়োজনকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ইতিবাচক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।
প্রায় ৭০ মিটার দীর্ঘ ও ৫০ সেন্টিমিটার উঁচু বেয়ু ট্যাপেস্ট্রিতে ১০৬৬ সালে নরম্যানদের ইংল্যান্ড বিজয়ের আগের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। একাদশ শতাব্দীর এই ঐতিহাসিক শিল্পকর্মে উইলিয়াম দ্য কনকারারের ইংল্যান্ড জয়ও চিত্রিত হয়েছে। জুলাইয়ে এটি লন্ডনে নেওয়া হয় এবং প্রদর্শনীর সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।
ম্যাক্রোঁ বলেন, দুই দেশের শতাব্দীজুড়ে অভিন্ন ইতিহাসের মতো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় এক দশক ধরে ট্যাপেস্ট্রিটি যুক্তরাজ্যে প্রদর্শনের উদ্যোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
অভিবাসন ঠেকাতে যৌথ উদ্যোগবৃহস্পতিবারের বৈঠকে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ ঠেকাতে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হবে। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, পাচারকারীদের ব্যবহৃত আরও বড় ও শক্তিশালী ‘মেগা ডিঙ্গি’ ঠেকানোর বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৪৫ জন ফরাসি কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠিত একটি ‘সার্জ টিম’ সৈকতে মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তাদের লক্ষ্য হবে বড় নৌকায় অভিবাসীদের যাত্রা ঠেকাতে ফরাসি কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা।
ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, চলতি গ্রীষ্মে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে অভিবাসী বহনকারী ছোট নৌকার সংখ্যা ২০১৯ সালের পর সবচেয়ে কম ছিল। ফ্রান্সের সঙ্গে করা প্রয়োগমূলক চুক্তির সাফল্যের অংশ হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরেছে লন্ডন।
তবে বার্নহাম সতর্ক করে বলেছেন, এ নিয়ে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, পাচারকারী চক্রগুলো নিয়মিত কৌশল পরিবর্তন করছে। ফলে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে দ্রুত পরিস্থিতির জবাব দিতে হবে।
ইউক্রেন ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন নেইরাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতি ব্রিটেনের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন বার্নহাম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরেই তিনি কিয়েভে গিয়েছিলেন।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বক্তব্য দেওয়ার সময় ম্যাক্রোঁ ইউক্রেনকে সমর্থনে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘স্ক্যালপ’-এর বিভিন্ন উপাদানসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ করেন। ফ্রান্সে তৈরি স্ক্যালপ যুক্তরাজ্যের ‘স্টর্ম শ্যাডো’ ক্ষেপণাস্ত্রের ফরাসি সংস্করণ।
বার্নহাম বলেন, ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হলেও ইউক্রেন বিষয়ে দেশটির নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু রাখার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছে ডাউনিং স্ট্রিট।
ব্রেক্সিটের পর সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগযুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়—এমন ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের ধারণাকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী ম্যাক্রোঁ। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলেও যুক্তরাজ্যকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে ফ্রান্স।
ম্যাক্রোঁ বলেন, প্যারিস ও লন্ডন সব বিষয়ে একমত নয়। তবে পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়টিও রয়েছে।
ব্রেক্সিটের পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার যে উদ্যোগ সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার নিয়েছিলেন, তা এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন বার্নহাম।
তিনি বলেন, তার পূর্বসূরি যে অর্জন করে গেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কিংস কলেজ লন্ডনের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ মেনন সতর্ক করেছেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতীকী আয়োজন ও কৌশলগত বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব অগ্রগতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে শুধু ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আবহ তৈরি করে বড় ফল পাওয়া কঠিন।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক