জিপিএস ট্র্যাকার কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করে তা মোবাইল নেটওয়ার্ক, ওয়াই-ফাই বা অন্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিভাবকের ফোন কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাঠায়। কিছু ডিভাইসে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে চলে গেলে সতর্কবার্তা, আগের অবস্থানের তথ্য এবং জরুরি এসওএস বার্তা পাঠানোর সুবিধাও থাকে।
তবে ট্র্যাকারকে শিশুর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না। ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়া, নেটওয়ার্ক না থাকা কিংবা শিশুর কাছ থেকে ডিভাইস খুলে ফেলার মতো কারণে এটি অকার্যকর হতে পারে।
কীভাবে কাজ করেজিপিএস স্যাটেলাইট পৃথিবীর দিকে বেতার সংকেত পাঠায়। ট্র্যাকার সেই সংকেত গ্রহণ করে নিজের অবস্থান নির্ণয় করে। স্যাটেলাইট সরাসরি কোনো ব্যক্তি বা ট্র্যাকারকে অনুসরণ করে না।
অবস্থান নির্ণয়ের পর সেটি অভিভাবকের কাছে পাঠাতে আলাদা যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। শিশুদের জন্য ব্যবহৃত ৪জি জিপিএস ট্র্যাকার সাধারণত মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সিম ব্যবহার করে।
তাই শুধু ‘জিপিএস আছে’ দেখলেই হবে না। ডিভাইসটি কোন মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, ৪জি সমর্থন করে কি না, লোকেশন কত ঘন ঘন আপডেট হয়, অ্যাপের কার্যকারিতা এবং ব্যাটারি কতক্ষণ চলে—এসবও দেখা প্রয়োজন।
খোলা আকাশের নিচে জিপিএস তুলনামূলক ভালো কাজ করলেও ভবন, দেয়াল, গাছপালা কিংবা ঘরের ভেতরে নির্ভুলতা কমতে পারে। জিপিএস ডটগভের তথ্য অনুযায়ী, খোলা আকাশে সাধারণ স্মার্টফোন প্রায় ৪ দশমিক ৯ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে অবস্থান দেখাতে পারে।
বাংলাদেশে যেসব ট্র্যাকার পাওয়া যায়বাংলাদেশের বাজারে শিশু, ব্যক্তি, গাড়ি ও পোষা প্রাণীর জন্য বিভিন্ন ধরনের ট্র্যাকার পাওয়া যায়। তবে সব ডিভাইস শিশুর জন্য উপযোগী নয়।
জিএফ-২১: প্রায় ৩ হাজার ৩০০ টাকায় পাওয়া যায়। আকার ২ দশমিক ৫ × ৩ দশমিক ৫ × ১ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ২০ গ্রাম। এতে জিপিএস, এজিপিএস, ওয়াই-ফাই, এলবিএস পজিশনিং, জিওফেন্স, লোকেশন হিস্ট্রি ও এসওএস সুবিধার কথা বলা হয়েছে। ব্যাটারি ৪৫০ এমএএইচ এবং ব্যাটারি লাইফ ২–৩ দিন দাবি করা হয়েছে। তবে তালিকায় জিপিএস নির্ভুলতা ৫০–৫০০ মিটার পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে।
সাইনোট্র্যাক এসটি-৯০৩: দাম ৩ হাজার ৪৫০ টাকা। এতে ১ হাজার ৫০ এমএএইচ ব্যাটারি, জিওফেন্স, রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ও আইপি৬৭ ওয়াটারপ্রুফ সুবিধা রয়েছে। ব্যাটারি প্রায় ২০ ঘণ্টা এবং স্ট্যান্ডবাই ৭–১০ দিন থাকার দাবি করা হয়েছে। এটি ব্যক্তি ও যানবাহন—দুই ধরনের ট্র্যাকিংয়ের জন্য বাজারজাত করা হয়।
সাইনোট্র্যাক এসটি-৯১৫: দাম ৬ হাজার ৪৯৯ টাকা। এতে ১০ হাজার এমএএইচ ব্যাটারি, জিপিএস/এজিপিএস/এলবিএস পজিশনিং, জিওফেন্স, রুট হিস্ট্রি ও ওয়াটারপ্রুফিংয়ের কথা বলা হয়েছে। তবে ডিভাইসটির ওজন প্রায় ২০০ গ্রাম এবং আকার ৭ × ৮ × ২ সেন্টিমিটার। মূলত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের জন্য তৈরি হওয়ায় শিশুর ক্ষেত্রে এর আকার বড় সীমাবদ্ধতা।
ইজিট্র্যাক্স পিএল২০০ কিডস ট্র্যাকার: শিশুদের জন্য বাজারজাত এ ডিভাইসটির দাম ৮ হাজার টাকা। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী এতে ৪জি এলটিই, ২জি ফলব্যাক, জিপিএস/বিডিএস, জিএলওএনএএসএস, এসওএস, দুইমুখী কল, লাইভ ম্যাপ ও ৯০ দিনের লোকেশন হিস্ট্রি রয়েছে। অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস অ্যাপ এবং ওয়েব ড্যাশবোর্ডও দেওয়া হয়। কোম্পানি এক বছরের ওয়ারেন্টি এবং বিটিআরসি অনুমোদনের কথা জানিয়েছে।
স্মার্টওয়াচে ট্র্যাকিংহোকো ওয়াই১০৮-এর মতো ৪জি কিডস স্মার্টওয়াচে জিপিএস, এলবিএস ও ওয়াই-ফাই পজিশনিং, এসওএস কল, সিম কলিং এবং আইপিএক্স৭ ওয়াটারপ্রুফিং সুবিধা রয়েছে। এর দাম ৩ হাজার ৯৯০ টাকা এবং ৭৩০ এমএএইচ ব্যাটারি ১–২ দিন চলার কথা বলা হয়েছে।
তবে শিশুর হাতে দৃশ্যমান ও দামি স্মার্টওয়াচ থাকলে সেটি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শুধু বেশি ফিচার বা আকর্ষণীয় নকশা দেখে শিশু নিরাপত্তার জন্য স্মার্টওয়াচ বেছে নেওয়া ঠিক নয়।
কেনার আগে যেসব বিষয় দেখবেনশিশুর জন্য ট্র্যাকার কেনার আগে অন্তত এসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন—
৪জি বা বর্তমান মোবাইল নেটওয়ার্ক সমর্থন করে কি না;
জিপিএসের পাশাপাশি অন্য পজিশনিং ব্যবস্থা আছে কি না;
ব্যাটারি বাস্তবে কতক্ষণ চলে;
লোকেশন কত ঘন ঘন আপডেট হয়;
লোকেশন হিস্ট্রি সংরক্ষণ করা যায় কি না;
জিওফেন্স অ্যালার্ট রয়েছে কি না;
এসওএস বোতাম আছে কি না;
ডিভাইসটি কতটা ছোট ও হালকা;
পানি ও ঘাম থেকে সুরক্ষা আছে কি না;
কোন অ্যাপ ব্যবহার করতে হয় এবং সেটি নিয়মিত হালনাগাদ হয় কি না;
সিম ও ডেটা ব্যবহারে অতিরিক্ত খরচ আছে কি না;
বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না।
বিকল্প হিসেবে ব্লুটুথ ট্র্যাকারএয়ারট্যাগ বা অ্যান্ড্রয়েডের ফাইন্ড হাব-সমর্থিত ব্লুটুথ ট্র্যাকার আকারে ছোট এবং ব্যাটারি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এয়ারট্যাগ নিজে মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত হয় না; ব্লুটুথ সংকেতের মাধ্যমে আশপাশের অ্যাপল ডিভাইসের সহায়তায় লোকেশন ফাইন্ড মাই নেটওয়ার্কে পাঠানো হয়। অ্যাপল জানিয়েছে, তাদের ফাইন্ড মাই নেটওয়ার্কে এক বিলিয়নের বেশি অ্যাপল ডিভাইস যুক্ত রয়েছে।
অ্যান্ড্রয়েডের ফাইন্ড হাবও আশপাশের অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ট্র্যাকার ট্যাগের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। তবে এগুলোকে ৪জি জিপিএস ট্র্যাকারের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গুগলও এসব ট্যাগকে মূলত চাবি, লাগেজ বা বাইকের মতো জিনিস খুঁজে পাওয়ার জন্য উপযোগী হিসেবে উল্লেখ করে।
স্মার্টফোন ও জিওফেন্সিংবড় শিশুদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন নিজেই লোকেশন শেয়ারিংয়ের মাধ্যম হতে পারে। তবে ফোনের ব্যাটারি শেষ হওয়া, হারিয়ে যাওয়া বা বন্ধ করে রাখার মতো সমস্যা রয়েছে। ছোট শিশুদের হাতে ফোন দেওয়া সব সময় বাস্তবসম্মতও নয়।
জিওফেন্সিং আলাদা কোনো হার্ডওয়্যার নয়; এটি জিপিএস ট্র্যাকার বা ফোনের সফটওয়্যারভিত্তিক একটি সুবিধা। এর মাধ্যমে স্কুল বা বাড়ির মতো নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করা যায়। শিশু সেই এলাকার বাইরে গেলে অভিভাবকের কাছে সতর্কবার্তা আসতে পারে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তব নিরাপত্তাব্যবস্থাশিশুর নিরাপত্তায় শুধু ট্র্যাকারের ওপর নির্ভর না করে স্কুলে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় পরিচয় যাচাই, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া শিশুকে অন্য কারও সঙ্গে না পাঠানো, নিরাপদ পিক-আপ ব্যবস্থা, সিসিটিভি এবং জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ট্র্যাকার এমন জায়গায় রাখা উচিত, যেখানে শিশুর শরীরে আঘাত বা শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি না হয় এবং ডিভাইসটি সহজে হারিয়ে না যায়। শিশুকে জানিয়ে রাখা ভালো যে তার সঙ্গে একটি নিরাপত্তা ডিভাইস রয়েছে এবং সেটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে।
সবশেষে, জিপিএস ট্র্যাকারকে নিরাপত্তার ‘জাদুকরি’ সমাধান হিসেবে না দেখে অতিরিক্ত একটি নিরাপত্তা স্তর হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ডিভাইসটি কার্যকর থাকবে তখনই, যখন ব্যাটারি ও নেটওয়ার্ক সচল থাকবে, অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হবে এবং সেই তথ্য নিরাপদভাবে অভিভাবকের কাছে পৌঁছাবে।
শিশুর নিরাপত্তায় তাই সচেতনতা, নিরাপদ যাতায়াত, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য ট্র্যাকার—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহারই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: জিপিএস ডটগভ, অ্যাপল, ইজিট্র্যাক্স বাংলাদেশ, হোকো বাংলাদেশ ও বিডিস্টল।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক