৩১ থেকে শতাধিক গ্রিন শিপইয়ার্ড গড়ার পরিকল্পনা, বর্জ্য শোধনে ব্যয় দেড় হাজার কোটি টাকা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪২ দুপুর
  • ৫১১৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে গ্রিন সার্টিফায়েড শিপইয়ার্ডের সংখ্যা শতাধিক করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশে এ ধরনের ৩১টি শিপইয়ার্ড রয়েছে। আরও ৬ থেকে ৭টি শিপইয়ার্ডকে গ্রিন সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

একই সঙ্গে জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের পরিবেশগত মান উন্নয়নে বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশেষ অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক ও চীনের একটি ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাহাজ নির্মাণে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, নকশা তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতেও বিশেষ প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।

পুরোনো জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে বড় সম্ভাবনা

বৈশ্বিক বাজারে পুরোনো জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে চায় সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশগত মান নিশ্চিত করে এ শিল্পের সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ খাতে রপ্তানি বাড়াতে সরকার নীতিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা দেবে।

তিনি বলেন, গত বছর পর্যন্ত বিশ্ববাজারের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের প্রায় ৯০ শতাংশ ভারত ও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে ছিল। উন্নত দেশগুলো সাধারণত এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও শ্রমঘন কাজ কম করে থাকে।

আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে বিপুলসংখ্যক পুরোনো জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের জন্য আসতে পারে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, একটি দক্ষ শিপইয়ার্ড বছরে তিন থেকে চারবার এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ তৈরি হবে।

জাহাজ নির্মাণে কমপ্লায়েন্স ও নকশা সক্ষমতায় জোর

জাহাজ নির্মাণ খাতের রপ্তানি সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান ও পরিবেশগত মান অনুসরণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজার থেকে জাহাজ নির্মাণের কার্যাদেশ পেতে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা অপরিহার্য। উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও নির্ধারিত মান পূরণ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কার্যাদেশ পাওয়া কঠিন।

তিনি জানান, জাহাজ নির্মাণ খাতের উন্নয়নে দুই ধাপের একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নকশা তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বিশেষায়িত কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দেশীয় উৎসের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও সংগ্রহ করা যাবে।

বেসরকারি শিপইয়ার্ডগুলোর জন্য রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে ব্যাংক গ্যারান্টি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ সমস্যা সমাধানে নৌবাহিনীর অধীন ডকইয়ার্ডগুলোর সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারি তত্ত্বাবধানে ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জাহাজ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে ‘ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি’ (টিএসডিএফ) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে জাহাজ ভাঙার সময় উৎপন্ন বিপজ্জনক বর্জ্য শোধন, নিরাপদে সংরক্ষণ ও পরিবেশসম্মতভাবে নিষ্পত্তি করা যাবে।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এ স্থাপনা নির্মাণের জন্য ৫৯ দশমিক ৩৫ একর জমি চিহ্নিত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাপান মেরিন সায়েন্সের (জেএমএস) সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।

প্রকল্পে অর্থায়ন বৈদেশিক ঋণে হবে, নাকি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। চারটি আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ঋণ প্রস্তাবে সুদহার ৩ থেকে ৪.৫ শতাংশ

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, টিএসডিএফ নির্মাণে অর্থায়নের জন্য বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন শর্তে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ জানিয়েছে।

জাইকা ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ সুদে ৩০ বছর মেয়াদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এতে ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রাখার কথা বলা হয়েছে।

এডিবি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদি ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে ২০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদহার ৩ দশমিক ১ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা রয়েছে। অন্যদিকে চীনের একটি ব্যাংক ৩ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদে ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তবে এসব প্রস্তাবের মধ্যে কোনটি গ্রহণ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরিবেশগত অবকাঠামোর অভাবে ইউরোপীয় জাহাজ হারানোর শঙ্কা

সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিদ্যমান আইন, বিধি, নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা এবং সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, টিএসডিএফ না থাকায় ইউরোপীয় জাহাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বাংলাদেশে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে আগ্রহ হারাচ্ছে এবং বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছে। ফলে এ শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ইউরোপীয় জাহাজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উন্নতমানের বিভিন্ন উপাদান থাকে। এসব জাহাজ আকৃষ্ট করতে বর্জ্য শোধন, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির উপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।

টেকসই শিল্পায়নের লক্ষ্য

সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রিন শিপইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ, উন্নত নকশা সক্ষমতা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও কার্যকর নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তথ্যসূত্র:

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির সভায় দেওয়া বক্তব্য

জাপান মেরিন সায়েন্সের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad