সন্তানের জন্মেই সংসার টিকবে কি না—এমন শঙ্কায় এক মায়ের আর্তনাদ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:১৭ দুপুর
  • ২৫৩৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg জাহিদা আক্তার বৃষ্টি
নার্সিং পেশায় রোগীর সেবা দিতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় জাহিদা আক্তার বৃষ্টিকে। তবে একটি ঘটনা আজও তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সিজারের জন্য হাসপাতালে ভর্তি এক অন্তঃসত্ত্বা নারী তাঁকে বলেছিলেন, ‘বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হবে, নয়তো সংসার টিকবে না।’ কিন্তু জন্মের মাত্র দুই দিন পর শিশুটির মৃত্যু হয়। মায়ের কান্না আর অসহায়ত্বের সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারেননি জাহিদা।

রাজশাহীর মেয়ে জাহিদা আক্তার বৃষ্টি বর্তমানে রাজধানীর গুলশানের সাহাব উদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত। মানুষের সেবা করার আগ্রহ এবং মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি এই পেশায় আসেন। তাঁর ভাষায়, নার্সিং শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধৈর্য, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও মানবিকতা।

২০১৯ সালে রাজশাহীর গ্লোবাল নার্সিং কলেজে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কোর্সে ভর্তি হন জাহিদা। তিন বছর মেয়াদি কোর্স শেষ করে প্লাজমা হাসপাতালে চাকরির মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু করেন। পরে যুক্ত হন সাহাব উদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

শিশু হারানোর সেই মায়ের কান্না

প্রথম কর্মস্থল প্লাজমা হাসপাতালে রাতের পালায় দায়িত্ব পালনকালে এক প্রসূতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সিজারের জন্য ভর্তি ওই নারী নিজের জীবনের নানা কথা জাহিদাকে বলতেন। একপর্যায়ে তিনি জানান, তাঁর সংসার টিকে থাকা না-থাকা নির্ভর করছে অনাগত সন্তানের বেঁচে থাকার ওপর।

জাহিদা তাঁকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, সন্তান বেঁচে থাকবে এবং সংসারও ভাঙবে না। কিন্তু সিজারের পর শিশুটি মাত্র দুই দিন বেঁচে ছিল। সন্তানের মৃত্যুতে মায়ের কান্না তাঁকে ভেতর থেকে নাড়া দেয়। ওই নারীর সংসারের পরিণতি কী হয়েছিল, তা আর জানা হয়নি তাঁর।

ঘটনাটি স্মরণ করে জাহিদা বলেন, একজন নারীর সংসার টিকে থাকার শর্ত যদি সন্তানের জন্মের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সেই নারী কোথায় আশ্রয় খুঁজবেন—এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

রোগীর চাপ সামলাতে ধৈর্য ও দলগত কাজ

নার্সিং পেশায় সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির একটি হলো রোগীর তুলনায় নার্সের সংখ্যা কম থাকা। একবার ওয়ার্ডে একসঙ্গে অনেক রোগী ভর্তি হওয়ায় সীমিত জনবল নিয়ে সেবা দিতে হয়েছিল তাঁকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুতর রোগীদের অগ্রাধিকার দেন। সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সেবা দেন।

জাহিদার মতে, চাপের সময় শান্ত থাকা, ধৈর্য ধরে দায়িত্ব পালন এবং দলগতভাবে কাজ করাই এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান উপায়।

পরিবারের দায়িত্ব ও পেশাগত টানাপোড়েন

কাজের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব সামলানোও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবারের তিন বোনের মধ্যে জাহিদা সবার বড়। ছোট দুই বোনের একজন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন, অন্যজন আগামীতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেবেন।

অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে না পারার কষ্টও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিছুদিন আগে তাঁর মায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছে। পাশাপাশি থাইরয়েড ও মাইগ্রেনের সমস্যাও রয়েছে। চাকরির কারণে বাবা দূরে থাকায় মায়ের দেখাশোনার জন্য পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিও সীমিত। দায়িত্বের কারণে সব সময় মায়ের কাছে যেতে না পারাকে মানসিক কষ্টের কারণ বলে উল্লেখ করেন জাহিদা। তবে সহকর্মীদের সহযোগিতা ও পরিবারের সমর্থনে পেশাগত দায়িত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

নার্সদের সম্মান ও কর্মপরিবেশের দাবি

দেশে নার্সরা তাঁদের কাজের যথাযথ সম্মান পান না বলে মনে করেন জাহিদা। তাঁর ভাষায়, নার্সরা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দূরে থেকে রোগীদের আপনজনের মতো সেবা দেন। কেউ তাঁদের কাছে বাবার মতো, কেউ ভাই বা বোনের মতো। অথচ সেই শ্রম ও দায়িত্বের তুলনায় অনেক সময় যথাযথ সম্মান মেলে না।

নার্সদের জন্য সম্মানজনক বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে রোগীর অনুপাতে নার্সের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত নার্স নিয়োগ করা হলে রোগীরা আরও মানসম্মত সেবা পাবেন।

জাহিদার অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, হাসপাতালের সেবাব্যবস্থায় নার্সদের ভূমিকা কেবল চিকিৎসকের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর শারীরিক সেবার পাশাপাশি তাঁদের মানসিক আশ্রয় ও মানবিক সহায়তারও প্রয়োজন হয়। সেই দায়িত্ব পালনে নার্সদের যথাযথ মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad